পদ্মায় ভাঙন, জাজিরায় কয়েক ঘণ্টায় বিলীন ১০০ মিটার এলাকা
পদ্মা নদীতে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় ১০০ মিটার এলাকা। ভাঙনের মুখে অন্তত ১০টি বসতঘর ও ছয়টি দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও বহু ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
ভাঙনের কারণে কাথুরিয়া গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কেরও বেশ কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে স্থানীয়দের চলাচলে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভাঙন ঠেকাতে ঘটনাস্থলে জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাথুরিয়া এলাকায় প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে ভাঙন শুরু হয়। গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) জুমার নামাজের সময়ও ওই এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়। এরপর ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকে। সোমবার সকালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ভুক্তভোগী লোকমান বলেন, ‘‘আমাদের এলাকায় আগে থেকে তীর রক্ষার কাজ শুরু হয়নি। কয়েক মাস আগে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। এখন ভাঙন শুরু হওয়ায় আমার ঘর সরিয়ে নিতে হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বর্ষার আগে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু করলে হয়তো আমার বাড়িটি ভাঙনের মুখে পড়ত না।’’
স্থানীয় বাসিন্দা রব মাদবর বলেন, ‘‘হঠাৎ করেই ভোররাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আশপাশের বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছি। ভাঙন ঠেকানো না গেলে আরও অনেক বাড়িঘর নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’
পালেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল ফরাজী বলেন, ‘‘শুধু গতকাল নয়, প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে থেকেই এ এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের আগে হঠাৎ প্রায় ২৫ ফুট জায়গা পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। বিষয়টি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’’
ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান। তিনি বলেন, ‘‘ভাঙন শুরু হওয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুকনা খাবারসহ তাৎক্ষণিকভাবে যতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, তা করা হয়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাদের বলা হয়েছে।’’
এদিকে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে জাজিরা উপজেলার নদীতীর রক্ষায় প্রায় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা ছিল, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ শেষ হবে। তবে প্রকল্পের কিছু অংশের কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় নদীর পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের একটি অংশের নকশা পরিবর্তন এবং প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের অনুমোদন পেতে মন্ত্রণালয়ে সময় লাগায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই দুই কিলোমিটার অংশের কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এ শামীম বলেন, ‘‘সোমবার সকাল থেকে কাথুরিয়া এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙনরোধ করা সম্ভব হবে।’’
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘‘প্রকল্পের একটি অংশের অনুমোদন পেতে বিলম্ব হওয়ায় কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভাঙনের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’
পদ্মার পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পালেরচর ও পূর্ব নাওডোবার বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এসব এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে চলতি বর্ষায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।
এসএ




Comments