এসএওসিএলে নিয়োগের অনিয়ম, শিক্ষানবিশকাল শেষ হওয়ার আগেই পদোন্নতি
থলের বিড়াল কি বের করতে পারবে দুদক?
অভিযোগের পরও ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী বহাল
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে (এসএওসিএল) নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মের তোয়াক্কা না করে তাঁদের কেউ নিয়োগ পেয়েছেন সরাসরি, কেউ আবার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই পেয়েছেন উচ্চ পদ। কারও ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, কারও বয়সসীমা শিথিল করা হয়েছে। এমনকি শিক্ষানবিশকাল শেষ হওয়ার আগেই কয়েকজনকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলো অডিটে ধরা পড়ার পর ২০২১ সালে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির অনুসন্ধানেও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয় উঠে আসে। সরকারি অডিট প্রতিবেদনেও একই ধরনের বেশ কিছু অনিয়মের উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের বেশির ভাগই এখনো এসএওসিএলে কর্মরত।
সম্প্রতি পুরোনো সেই অভিযোগই নতুন করে সামনে এসেছে। চলতি বছরের ১৯ মে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিনকে অভিযোগটির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগে নাম থাকা ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করা হয়েছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। এসব নথি প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বার্ষিক অডিট প্রতিবেদনে এসএওসিএলের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগে বিভিন্ন বিধি লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরা হয়। ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে চাকরিতে যোগদানের নিয়ম না মানা, অস্থায়ী নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু আবেদনের ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগ, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই উচ্চ পদে নিয়োগসহ নানা অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ না করে ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির (ম্যাক) মাধ্যমে ৮৯ দিনের জন্য ক্যাজুয়াল নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে একই ব্যক্তিদের স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিধিমালার পরিপন্থী। ২০১২ সালের ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৩৪৪তম সভায় জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলেও অডিটে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে সব পদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারণ করা হলেও ক্যাজুয়াল নিয়োগের ক্ষেত্রে এ শর্ত মানা হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী ৮৯ দিনের অস্থায়ী নিয়োগের পর এক বছরের শিক্ষানবিশকাল শেষে স্থায়ী করার বিধান থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করেও মো. শহিদুল ইসলামকে সিনিয়র অফিসার (মেইনটেন্যান্স) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। চাকরিপ্রার্থীদের দাখিল করা সনদপত্রও যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি বা মানদণ্ড অনুসরণ না করে ইচ্ছামতো পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন চাকরি করেও অনেকে পদোন্নতি না পেলেও কেউ কেউ মাত্র দুই বছরের মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের তালিকায় থাকা ১৪ জনের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (মেইনটেন্যান্স) এম-৬ মো. শহিদুল ইসলাম, টেকনিক্যাল কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনিষ্ঠ কর্মকর্তা (টেকনিক্যাল) দুর্জয় দে, অপারেশন কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ, সহকারী ব্যবস্থাপক (এম-৫) প্রলয় চক্রবর্তী, কনিষ্ঠ কর্মকর্তা (বিক্রয়) মো. শাহাদাৎ হোসেন, উপব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন) মোহাম্মদ মোকাররম হোসেন, উপব্যবস্থাপক (হিসাব) মাহমুদুল হক তুষার, অপারেশন কর্মকর্তা শামিম শহিদ, কর্মকর্তা (এইচআর) আবদুল্লাহ আল মামুন, কর্মকর্তা (বিক্রয়) মো. মীর হোসেন, ব্যবস্থাপক (প্রোডাক্ট অ্যান্ড অপারেশন) মো. ছিদ্দিকুর রহমান এবং অফিস সহকারী মো. আশরাফ উদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কয়েকজনের নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ শাহেদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি প্রভাব ফেলেছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি এখন দুদকের অনুসন্ধানের আওতায়।
অডিটে অনিয়ম ধরা পড়ার পর ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল এসএওসিএলের তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদের সই করা অফিস আদেশে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে অভিযোগগুলো অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয় উঠে আসে এবং প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর আগে এসএওসিএলের অডিট আপত্তি নিয়ে গঠিত কমিটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২১ সালের এ কমিটি গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, অভিযোগে নাম থাকা এসএওসিএলের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করা হয়েছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নথি জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সেসব নথি সংগ্রহের পর প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
এসএওসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এটি অনেক আগের ঘটনা। আমি মাত্র দুই মাস আগে এই অফিসে যোগদান করেছি।’
২০২১ সালের অডিট প্রতিবেদনে ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।’
অভিযোগের বিষয়ে টেকনিক্যাল কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অন্যায়। তাঁর প্রশ্ন, ‘২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অন্তত ১০৯ জনের নিয়োগ হয়েছে। তবে কেন শুধু আমাদের ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলো? বাকিদের নিয়ে কেন কোনো প্রশ্ন উঠছে না?’
হিসাব কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কনিষ্ঠ কর্মকর্তা (টেকনিক্যাল) দুর্জয় দে বলেন, ‘কোম্পানির নির্ধারিত নিয়ম মেনেই আমার নিয়োগ হয়েছে। এ বিষয়ে আমার আর নতুন করে কোনো মন্তব্য নেই।’
অপারেশন কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘আমি তো নিজে নিজেকে নিয়োগ দিতে পারি না। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়োগ দিয়েছে। সম্প্রতি দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কর্মকর্তা মণিলাল সাহেব নাকি সবাইকে নিয়োগ দিয়েছেন, কিন্তু বিষয়টি সত্য নয়। আমাদের নিয়োগ দিয়েছে কোম্পানি, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তা হয়েছে।’
অভিযোগের তালিকায় থাকা ১৪ জনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন এবং ব্যবস্থাপক মো. ছিদ্দিকুর রহমান চাকরি ছেড়েছেন। বাকি ১২ জন এখনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।
বছরের পর বছর অডিট আপত্তি, তদন্ত কমিটি ও নানা অভিযোগের পরও যেহেতু দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা হয়নি, তাই এবার দুদকের অনুসন্ধান ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘদিন ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা নিয়োগের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র কি এবার বের হবে? নাকি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা অভিযোগগুলোও আগের মতোই ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে?
এর উত্তর নির্ভর করছে দুদকের নথি যাচাই, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অনুসন্ধান শেষে কমিশনে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর।
এসএ




Comments