মানুষের করা সামান্য এক ভুলের খেসারতে টানা ৫০ বছর ধরে নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছিল জাপানের একটি দ্বীপ! আর সেই ভুলের পেছনে জড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের নাম। শুনতে অবাক লাগলেও, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে নেওয়া সেই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল জাপানকে দিতে হয়েছে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭৯ সালে। জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে বিষাক্ত ‘হাবু’ সাপের উপদ্রব কমানোর জন্য বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বংশের ৩০টি ক্ষুদ্র ভারতীয় বেজি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। জাপানিজ বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা ছিল, বেজিগুলো বিষধর সাপ খেয়ে দ্বীপের পরিবেশ নিরাপদ করবে। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের ছককাটা হিসাব মেনে চলেনি। হাবু সাপ ছিল মূলত নিশাচর প্রাণী, আর বেজি শিকারে বের হতো দিনের আলোতে। ফলে সাপের সঙ্গে বেজির লড়াই হওয়ার সুযোগই ছিল খুব কম।
প্রাকৃতিক কোনো শত্রু না থাকায় দ্বীপে বেজিদের বংশবৃদ্ধি ঘটে জ্যামিতিক হারে। খাবারের খোঁজে তারা সাপের বদলে আক্রমণ শুরু করে দ্বীপের অতি বিরল প্রজাতির ‘আমামি খরগোশ’সহ স্থানীয় সাতটি দুর্লভ প্রজাতির ওপর। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, দ্বীপের জীববৈচিত্র্য মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সাপের উপদ্রব কমাতে গিয়ে উল্টো দ্বীপের নিজস্ব প্রাণিকুল বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে যায়।
এই ভুলের চড়া মূল্য চোকাতে ১৯৯৩ সাল থেকে স্থানীয়ভাবে এবং ২০০০ সাল থেকে জাতীয়ভাবে শুরু হয় এক বিশাল পরিবেশগত লড়াই। প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটারের এই ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ দ্বীপে পাতা হয় ৩০ হাজার ফাঁদ ও সেন্সর ক্যামেরা। স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স’ নামের একটি বিশেষ বাহিনী। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে ধরা পড়ে প্রায় ৩৩ হাজার বেজি!
অবশেষে ২০১৮ সালের এপ্রিলে দ্বীপে শেষবারের মতো একটি বেজি ধরা পড়েছিল। এরপর টানা ছয় বছর কড়া নজরদারির পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমামি ওশিমা দ্বীপকে সম্পূর্ণ ‘বেজিমুক্ত’ ঘোষণা করে জাপান সরকার। বিশ্ব পরিবেশের ইতিহাসে আক্রমণাত্মক কোনো প্রাণী নির্মূলের এটিই প্রথম সবচেয়ে বড় ও সফল ঘটনা। যাকে পরিবেশবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা এককথায় ‘অলৌকিক জয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে ঘটনার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—৫০ বছরের দীর্ঘ লড়াই আর বিপুল অর্থ খরচ করে বেজি থেকে মুক্তি পেলেও, যে হাবু সাপের জন্য এই কান্ড, সেই বিষাক্ত সাপ কিন্তু আজও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে দ্বীপের জঙ্গলে! আমামি ওশিমা দ্বীপের এই গল্প গোটা পৃথিবীর জন্য এক বিশাল শিক্ষা। মানুষের সামান্য এক অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি সাজানো গোছানো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, এটি তার এক অনন্য উদাহরণ।
ডিআর




Comments