হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের থাবায় ঝরলো ৯ প্রাণ
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের শর্ত অমান্য করেই চলছিল ফেরদৌস শিপইয়ার্ড
গ্যাসের ঘনত্ব মাপা হয় পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) এককে। হাইড্রোজেন সালফাইড স্বাভাবিক ঘনত্ব শূন্য দশমিক তিনশূন্য এক থেকেশূন্য দশমিক তিনশূন্য দুই পিপিএম। আবদ্ধ স্থানে কাজের ক্ষেত্রে এই মাত্রাগুলো মেনে চলা বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা শুরুতে মানেনি ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড। মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড কারণে নয় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে বলে জানিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। শনিবার সকালে দুর্ঘটনাকবলিত শিপ ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে তিনি এ তথ্য জানান। এসময় সাথে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেনসহ অনেকে। এদিকে ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও মামলা হয়নি।
এছাড়া, গত ৯ ফেব্রুয়ারি কারখানার নিরাপত্তা ঘাটতি ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম পেয়েছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। সেখানে ওই শিপইয়ার্ড পরিচালনা করার জন্য একাধিক শর্ত দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো শর্ত পূরণ না করে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেলে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে জানিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ। তিনি জানান, ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড কয়েক ধাপে ধাপে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ জবাব দেয়নি। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়।
এদিকে, শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নয় সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার রাতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহাবুবুল হককে আহ্বায়ক ও সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দল্লাহ আল মামুনকে সদস্য সচিব করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে এগার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে, শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল নয়টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটে। জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহন করত। এটি কাটার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ৫২৯তম সভায় প্রতিষ্ঠানটিকে ছাড়পত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের হিসাবে, দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল নিহত আটজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি একজন আজ (শনিবার) তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতদের আরও অন্তত ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেবে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বলে জানা গেছে।
যারা প্রাণ হারিয়েছেন
নিহত ব্যক্তিরা হলেন সীতাকুণ্ডের আকবর আলীর হাট এলাকার দুই ভাই মোহাম্মদ মনসুর (৫৫) ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগরের ছৈয়দপুর এলাকার মোহাম্মদ আব্দুল আলীম (৩৬), গাইবান্ধা সদরের উত্তর কুপতলা এলাকার মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের খাদেমপাড়া এলাকার হাবিবুর রহমান (৫১), ভাটিয়ারীর পলাশ জলদাস (৩৫), সানি জলদাস (২৩) ও মতিউর রহমান (১৯) এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩) ।
স্থানীয়রা যা বলছেন
শুত্রবার সকাল নয়টার দিকে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুরু হয়। তারা কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কয়েকজনকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। পরে জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তাদের ভাষ্য মতে, শুক্রবার কারখানাটি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শ্রমিকদের দিয়ে ইয়ার্ডে কাজ করানো হচ্ছিল। কাজ চলার সময় সেফটি টিমের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে তাঁরা দাবি করেন।
পুলিশ বলছে
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, গতকাল শ্রমিক নিহতের ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এখনও নিহতরে পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে আসেনি। তবে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এসএ




Comments