যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব ও মানসিক চাপ, সবকিছুর মধ্যেই গাজায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে সংগ্রাম করছেন মায়েরা। কঠিন পরিস্থিতিতে নবজাতক ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলছে বিশেষ পরামর্শ ও সহায়তা কার্যক্রম।
গাজার দেইর আল-বালাহর হিকর আল-জামি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কর্নার’-এ সপ্তাহে দুবার আসেন ৩৮ বছর বয়সী ইমান হুনেইদক। নয় মাসের মেয়ে ওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেখানে বুকের দুধ খাওয়ানো বিষয়ে পরামর্শ নেন। তিন সন্তানের মা ইমানের ডায়াবেটিসসহ রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা রয়েছে। ১৪ বছর পর তাঁর এই সন্তান জন্ম নেয়। যুদ্ধের মধ্যে গর্ভধারণ, বাস্তুচ্যুতি ও সীমিত চিকিৎসাসেবার কারণে তাঁর গর্ভকাল ছিল অত্যন্ত কঠিন।
গর্ভাবস্থার পাঁচ মাস না হওয়া পর্যন্ত তিনি জানতেনই না যে তিনি সন্তানসম্ভবা। পরে উত্তর গাজা থেকে দেইর আল-বালাহতে বাস্তুচ্যুত হন তিনি। অপুষ্টি ও চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগের কারণে গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।
নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয় ওয়ার্ড এবং ১০ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়াতেও সমস্যায় পড়েন ইমান। স্তনে ক্ষত তৈরি হওয়ায় কিছু সময় ফর্মুলা দুধের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। তবে গাজায় ফর্মুলা দুধ ব্যয়বহুল এবং এটি প্রস্তুত করতে বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
মায়েদের জন্য নিরাপদ সহায়তার জায়গা
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নার্সিং ম্যানেজার ও স্তন্যদান বিশেষজ্ঞ সাবরিন আল-বুহাইসি জানান, প্রতি মাসে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ নারী সেখানে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সহায়তা নেন। বাস্তুচ্যুতি, স্বজন হারানো, মৃত্যু, অর্থনৈতিক সংকট ও খাদ্যাভাব মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর ওপর প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।
শুধু মাকে পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে পরিবারকেও এই কার্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে। মায়ের স্বামী ও অন্যান্য স্বজনকে বোঝানো হচ্ছে কীভাবে একজন স্তন্যদানকারী মাকে সহযোগিতা করতে হবে। কেন্দ্রটির আরেক স্তন্যদান বিশেষজ্ঞ ইমান আবু ওদা জানান, অনেক মা মনে করেন পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া ও মানসিক চাপের কারণে তাঁদের বুকের দুধ কমে যাচ্ছে বা তাঁরা সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারবেন না।
স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে কঠিন পরিস্থিতিতেও অনেক মা বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে পারেন। তবে একই সঙ্গে গাজায় খাদ্যসংকটের ভয়াবহতাও তুলে ধরছেন তাঁরা। মাংস, মাছ ও ফল অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে। তাই তুলনামূলক সস্তা ডাল, শিম ও ছোলার মতো খাবার এবং পাওয়া গেলে পুষ্টি-সহায়ক উপাদান ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সন্তান হারানোর পরও বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা
২৩ বছর বয়সী হিবা আল-মাসরির গল্প আরও বেদনাদায়ক। যুদ্ধের শুরুর দিকে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মাত্র ২০ দিনের মেয়েকে হারান তিনি। এখন তাঁর তিন মাস বয়সী ছেলে ইউসুফকে নিয়ে আবারও বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। স্বামী ও পরিবারের আরও ১৫ সদস্যের সঙ্গে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন হিবা। অতিরিক্ত ভিড়, গোপনীয়তার অভাব, অন্য সন্তানদের দেখাশোনা এবং অপুষ্টির কারণে তাঁর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহায়তায় ইউসুফের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে বলে জানান তিনি। হিবার ভাষায়, ফর্মুলা দুধের চেয়ে বুকের দুধ অনেক ভালো।
তাঁবুর জীবনেও সন্তানকে আগলে রাখার লড়াই
স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া সহায়তা ইমানের মতো মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে সাহায্য করলেও তাঁবুর বাইরের বাস্তবতা বদলায়নি। পানি বহন করা, ধুলা-বালিতে ভরা পরিবেশ, প্রচণ্ড গরম-ঠান্ডা এবং পোকামাকড় ও ইঁদুরের উৎপাত- সবকিছুর মধ্যেই সন্তানদের বড় করছেন তাঁরা।
ইমান জানান, শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু তাঁবুতে সেই সুযোগ প্রায় নেই। শিশু ওয়ার্ড ঘুমিয়ে পড়লে তার পাশেই থাকেন ইমান। পোকামাকড় কিংবা ইঁদুর যেন শিশুটির কাছে যেতে না পারে, সেই ভয় তাঁকে তাড়া করে।
তারপরও মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় তিনি। ইমানের প্রশ্ন, ‘আমরা মায়েরা এসব পরিস্থিতি সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমাদের সন্তানদের দোষ কী?’
সুত্র- আল জাজিরা
এম আর এ




Comments