শরীয়তপুরে প্রেসক্লাবের প্রাচীর ভাঙার প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকের হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
শরীয়তপুরে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদ করায় সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি বিএম ইসরাফিলকে নৃশংসভাবে মারধর করে ডান হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে জেলা শহরের আমিনবাগ এলাকায় শরীয়তপুর প্রেসক্লাব চত্বরে এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে।
হামলায় প্রেসক্লাব সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি আবুল হোসেন সরদারের ছেলে পলাশ সরদার ও তার সহযোগীদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন আহত সাংবাদিক। ঘটনার পর সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের তিন দিকের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। রাতের আঁধারে এই প্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার পর বিএম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি প্রতিবাদী পোস্ট দেন এবং ঘটনার নিন্দা জানান।
পরদিন রোববার সকালে কয়েকজন সংবাদকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসক্লাব চত্বরে যান ইসরাফিল। সেখানে আগে থেকেই প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন সরদার উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিছুক্ষণ পর ১০ থেকে ১২ জন লোক নিয়ে সেখানে অতর্কিত হামলা চালান সভাপতির ছেলে পলাশ সরদার। এ সময় পলাশ ও তার সহযোগীরা ইসরাফিলকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করেন। পরে অন্য সাংবাদিকেরা তাকে হামলাকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আকরাম এলাহী সাংবাদিকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে জানান, বিএম ইসরাফিলের ডান হাতের কব্জি গুরুতরভাবে ভেঙে গেছে। এছাড়া তার কপাল, বুকের পাঁজর ও হাঁটুতে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আহত সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল বলেন, "জেলা প্রশাসনের নির্দেশে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলার খবর পেয়ে আমি বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলি। পরে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পরই আমাকে এই হামলার শিকার হতে হয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেব।"
এদিকে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলা এবং সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে রোববার বিকেলে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা একটি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। সমাবেশ থেকে সাংবাদিকেরা অবিলম্বে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আমিনবাগ এলাকায় প্রেসক্লাবটি অবস্থিত। ১৯৯৮ সালে জেলা প্রশাসন প্রেসক্লাবের নামে ১৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীকালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ওই জমিতে প্রেসক্লাবের একটি একতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রেসক্লাবের পাশের জমিতে ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘শরীয়তপুর পার্ক’ নির্মাণ করা হয়। সম্প্রতি পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রেসক্লাবের জমিটি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। সাংবাদিকদের অভিযোগ, তাদের কোনো প্রকার অবহিত না করেই শনিবার রাতে সীমানা প্রাচীরের বড় একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন সরদার বলেন, "ফেসবুকে আমাকে নিয়ে সমালোচনা করায় আমার ছেলে পলাশ ও তার অনুসারীরা হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারে। তবে সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলার বিষয়ে আমি আগে থেকে কিছু জানতাম না। এ ঘটনায় আমি অত্যন্ত বিব্রত এবং আমি নিজেই আমার সন্তানকে আইনের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেব।"
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম এ প্রসঙ্গে বলেন, "সাংবাদিকদের বরাদ্দ দেওয়া জমিটি মূলত ভিপি সম্পত্তি হওয়ায় সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। আমরা সাংবাদিকদের জন্য অন্যত্র জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ওই জমিটি নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সীমানা প্রাচীর ভাঙার বিষয়টি প্রেসক্লাব সভাপতিকে জানানো হয়েছিল। তবে সাংবাদিকেরা যদি জমিটি ছাড়তে না চান, তবে আমরা আগের অবস্থায় সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে দেব।"
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) তানভীর হোসেন জানান, প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ভাঙার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবগত নন। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করে তিনি বলেন, "বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কেউ আইনি সহায়তা চাইলে পুলিশ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত পলাশ সরদার আত্মগোপনে রয়েছেন। তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
ডিআর




Comments