Image description

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও পিতৃপরিচয় না পাওয়ার অভিযোগে বাবার স্বীকৃতি ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ২৩ বছর বয়সী এক যুবক। জন্মের পর থেকে মায়ের কাছে বড় হলেও বর্তমানে শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পিতৃপরিচয় নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন তিনি।

অভিযোগকারী যুবকের নাম নাজিম উদ্দীন। তিনি উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার অভিযোগ একই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সোলতান মৌলানা পাড়ার বাসিন্দা ইয়াকুব সওদাগরের ছেলে মো. মোবারক হোসেনের (৪৮) বিরুদ্ধে।

লিখিত অভিযোগে নাজিম উদ্দীন দাবি করেন, প্রায় ২২ বছর আগে তার মা আছিয়া খাতুনকে গোপনে বিয়ে করেন মোবারক হোসেন। বিয়ের প্রায় দুই বছর পর তার জন্ম হয়। তবে সন্তান বড় না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখার শর্ত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তার মা একাই তাকে অত্যন্ত কষ্টে লালন-পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে মোবারক তার বা তার মায়ের কোনো খোঁজখবর নেননি। উল্টো বিভিন্ন সময়ে গালিগালাজ ও মানসিক নির্যাতন করেছেন বলে নাজিম অভিযোগে জানান।

নাজিম উদ্দীন আরও বলেন, লেখাপড়া শেষ করে বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, জাতীয়তা সনদ ও অন্যান্য পরিচয়পত্র তৈরির প্রয়োজন দেখা দিলে পিতৃপরিচয়ের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু এখন মোবারক তাকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। এতে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করা ও নাগরিক দলিলাদি তৈরির ক্ষেত্রে তিনি অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠকও হয়েছে। নাজিমের দাবি, একটি বৈঠকে মোবারক তাকে মুখ বন্ধ রাখতে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরবর্তী আরেকটি বৈঠকে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বললেও পিতার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে তিনি অটল অস্বীকৃতি জানান। তবে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অর্থের পরিবর্তে সন্তানের পৈতৃক পরিচয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এরপরও কোনো সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন নাজিম।

অভিযোগে আরও বলা হয়, পিতৃপরিচয়ের বিষয়ে চাপ দিলে মোবারক তাকে ও তার মাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির হুমকি দিয়ে আসছেন, যার ফলে তারা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় এক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নাজিমের মা আছিয়া খাতুন একসময় মোবারকের বাবার বাড়িতে কাজ করতেন। ওই সময় মোবারকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়। তখন বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে মোবারক বিদেশে চলে যান।

নিজের অধিকারের বিষয়ে আবেগাপ্লুত নাজিম উদ্দীন বলেন, “আমি কোনো অর্থ বা সম্পত্তি চাই না। আমি শুধু আমার বাবার স্বীকৃতি ও আইনগত অধিকার চাই। একজন সন্তান হিসেবে নিজের পরিচয় নিয়ে সমাজে বাঁচতে চাই।”

অভিযোগের বিষয়ে মো. মোবারক হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সোলতান মোহাম্মদ অহিদ বলেন, “পিতৃত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন। পিতৃত্ব প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সন্তানের পরিচয় ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে।”

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ-বিন-আখন্দ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “এ বিষয়ে একটি লিখিত আবেদন পেয়েছি। বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তির লক্ষে বড়হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

ডিআর