গ্যাস, কাঁচামাল ও যান্ত্রিক সমস্যায় দেশের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার ছয়টিই এখন বন্ধ। এর মধ্যে চট্টগ্রামের তিনটি কারখানাও রয়েছে। একমাত্র ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় উৎপাদন চলছে।
এতে সামনে আমন ও পরবর্তী রবি মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সার আমদানিতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা বন্ধ কারখানাগুলো হলো—চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার (জেএফসিএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি (এএফসিএল), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি (ডিএপিএফসিএল) এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি (এসএফসিএল)।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য) মো. মনিরুজ্জামান জানান, সাত কারখানার মধ্যে ছয়টি বন্ধ থাকলেও এক-দুই দিনের মধ্যে শাহজালাল সার কারখানায় উৎপাদন শুরু হতে পারে। আগামী আমন মৌসুমে সারের ঘাটতি হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
বিসিআইসির সাত কারখানার সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন।
সিইউএফএল গ্যাস সংকটে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ। কারখানাটিতে প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে এটি চালু হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গ্যাসের অভাবে একই সময় থেকে বন্ধ রয়েছে যমুনা সার কারখানাও। এর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন ইউরিয়া।
গ্যাস সংকটে গত বছরের ১ মার্চ থেকে বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা এই কারখানা বন্ধ থাকায় মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কাঁচামালের সংকটে গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ টিএসপি কারখানা। এতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টন টিএসপি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ না থাকায় গত ২৮ জুন থেকে ডিএপি ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন বন্ধ। এই কারখানায় গ্যাসের প্রয়োজন না হলেও কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন থেমে আছে।
শাহজালাল সার কারখানাতেও গ্যাসের অভাবে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে শিগগিরই কারখানাটি চালু হওয়ার আশা করছেন কর্মকর্তারা।
একমাত্র চালু থাকা ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ টনের বেশি সার উৎপাদন হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের মজুত রয়েছে যথাক্রমে ৫ লাখ ৬৮ হাজার, ৩ লাখ ৫২ হাজার, ৩ লাখ ৬৮ হাজার এবং ১ লাখ ৮১ হাজার টন।
তবে আসন্ন রবি মৌসুমে এসব সারের চাহিদা মজুতের তুলনায় অনেক বেশি। ইউরিয়ার চাহিদা ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন, ডিএপি ৯ লাখ ৮৮ হাজার, টিএসপি ৪ লাখ ৪৯ হাজার এবং এমওপি ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন।
কৃষি মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, চলতি মাসেই কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কোসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা সার দেশে আসবে। ফলে মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত থাকবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান দাবি করেছেন, দেশে বর্তমানে কোনো সারের সংকট নেই। সার ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরামর্শ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সার আমদানি আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। তাই বন্ধ সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করে দেশে উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।
তার মতে, একসময় বিসিআইসির কারখানাগুলো দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারত। এখন তা কমে প্রায় ২০ শতাংশে নেমেছে।
এদিকে সার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কৃষকরাও। রংপুরের কৃষকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সার একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ডিলারদের কাছে সার না থাকায় খুচরা বাজারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ফলে আমন মৌসুমে সার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
এসএস




Comments