নুসরাত হত্যা মামলা
১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়: বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা সীমিত করলেন হাইকোর্ট
ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নিম্ন আদালতের রায় যথাযথ বিচারিক বিবেচনায় দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই রায় দেওয়া বিচারক মামুনুর রশিদের ফৌজদারি মামলা পরিচালনার ক্ষমতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব নির্দেশনা দেন।
হাইকোর্টের রায়ে নিম্ন আদালতে দেওয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। তাঁরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম। এছাড়া চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। পরে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আসামিরা পৃথকভাবে আপিল ও জেল আপিল করেন।
মামলার নথি পর্যালোচনার পর হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথ বিচারিক মানসিকতা ও বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেননি। এ কারণে তাঁকে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর মা শিরীন আখতার। মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হলে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে কারাগার থেকে বের করার চেষ্টা করে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে কয়েকজন দেখা করে এবং পরদিন নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাঁকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।
পরে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান হত্যা মামলা করেন।
নিম্ন আদালতের রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম ছাড়াও রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন।
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। পরে এটি ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হওয়ায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি আসামিদের পৃথক আপিল ও জেল আপিলের শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়।
হাইকোর্টের রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বড় অংশ পরিবর্তিত হলো।
এসএ




Comments