মোহনপুরে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ঐতিহ্য
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হতো মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলস, সরা, বাসনসহ নানা ধরনের তৈজসপত্র। রান্না থেকে শুরু করে পানি সংরক্ষণ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল মাটির তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নের বেলনা গ্রামের পালপাড়াতেও একসময় দিন-রাত ব্যস্ত সময় কাটাতেন কুমাররা। মাটির তৈরি এসব সামগ্রী বিক্রি করেই চলত বহু পরিবারের সংসার।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। প্লাস্টিক, স্টিল, মেলামাইন ও সিরামিকের সস্তা ও টেকসই পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারে মাটির হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমেছে। ফলে বেলনা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা কমার পাশাপাশি এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন অনেকেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগেও বেলনা গ্রামের পালপাড়ায় ৩০টির বেশি পরিবার মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র আটটি পরিবারে। তাঁরাও সারা বছর নিয়মিত উৎপাদন করেন না। পূজা-পার্বণ, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান এবং মৌসুমি চাহিদাকে কেন্দ্র করে সীমিত পরিসরে মাটির পণ্য তৈরি করেন।
পালপাড়ার বাসিন্দা বিলাস পাল বলেন, প্রায় এক দশক ধরে তাঁদের এলাকায় আগের মতো মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি হয় না। বিক্রি কমে যাওয়ায় এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করে চাকরি, ব্যবসা কিংবা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন।
মৃৎশিল্পী শক্তি রানী বলেন, একটি পাতিল তৈরি করতে প্রায় ২৫ টাকা খরচ হয়। অথচ সেটি বিক্রি করে ২৮ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। মাটি সংগ্রহ, পণ্য তৈরি ও পোড়ানোর পর অনেক সময় পণ্য ভেঙেও যায়। এতে উৎপাদনকারীদের লোকসান গুনতে হয়। দিন দিন ব্যবসা কমে যাওয়ায় এ পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেলনা গ্রামের দীপঙ্কর কুমার পাল, শুভ কুমার পাল ও প্রশান্ত পাল জানান, সারা বছর মাটির তৈজসপত্রের তেমন চাহিদা থাকে না। এ কারণে তাঁরা বর্তমানে চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পূজা-পার্বণসহ বিশেষ সময়ে চাহিদা কিছুটা বাড়লেও তখন অনেক সময় বাইরে থেকে মাটির পণ্য এনে বিক্রি করতে হয়।
মাটির পণ্যের বিক্রেতা বিমল পাল বলেন, আগে প্রতি হাটে প্রায় চার হাজার টাকার মতো ব্যবসা হতো। এখন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বিক্রি হয় না। মেলামাইন, সিরামিক ও প্লাস্টিকের পণ্যের বিস্তারের কারণে মাটির সামগ্রীর বাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। বাপ-দাদার আমলের এই ব্যবসা ছাড়া তাঁরা তেমন কিছু জানেন না বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।
মাটির তৈরি পাতিল কিনতে আসা মুখলেস বলেন, মাটির পাতিলের দাম তুলনামূলক কম। রান্নায় এর আলাদা স্বাদ ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু বাজারে এখন এসব পণ্য আগের মতো পাওয়া যায় না।
শুধু ঐতিহ্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও অংশ
মৃৎশিল্প বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর একটি। মাটি দিয়ে মানুষের প্রয়োজনীয় ও নান্দনিক সামগ্রী তৈরির এ শিল্প একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কুমার সম্প্রদায়ের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেছে।
কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রায় প্লাস্টিক, স্টিল, মেলামাইন ও সিরামিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন খরচ, পণ্য পোড়ানোর ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারজাতকরণের সমস্যাও এ শিল্পের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাজারের অভাব। উৎপাদন করলেও ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এ পেশা আকর্ষণ হারাচ্ছে। পরিবারের সন্তানদের অনেকেই এখন চাকরি, ব্যবসা বা কৃষিকাজকে জীবিকার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
আধুনিক বাজারে যুক্ত করার সম্ভাবনা
তবে মৃৎশিল্পের ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার নয়। ঐতিহ্যবাহী হাঁড়ি-পাতিলের পাশাপাশি আধুনিক নকশায় টেরাকোটা, শোপিস, ফুলের টব, অলঙ্কার, সাজসজ্জার সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে নতুন বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। শহরাঞ্চলে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের প্রতিও মানুষের আগ্রহ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক নকশা, প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে মৃৎশিল্পীদের যুক্ত করা গেলে এ শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অনলাইনভিত্তিক বিপণন, মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং শহরের বাজারে সরাসরি পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি করাও হতে পারে সম্ভাবনাময় পথ।
মৃৎশিল্পীরা সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়ে বলেন, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত চুল্লি, উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্পকে আবারও লাভজনক করা সম্ভব। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. আনছার আলী বলেন, মৃৎশিল্প তাঁদের এলাকার পুরোনো ঐতিহ্য। শিল্পীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, বিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্পকে সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা তুলে ধরার এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও মেলার আয়োজন করা হলে মৃৎশিল্পীদের জন্য আলাদা স্টলের ব্যবস্থা করে তাঁদের পণ্য ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সচেতন মহলের মতে, মৃৎশিল্পকে শুধু অতীতের ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করলেই হবে না; এর সঙ্গে আধুনিক নকশা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে। উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় যুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তা না হলে কয়েক প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা বেলনা গ্রামের পালপাড়ার মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরির ঐতিহ্য একসময় শুধু স্মৃতির পাতাতেই থেকে যেতে পারে। আর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পই পরিবেশবান্ধব পণ্যের নতুন বাজারে ফিরে পেতে পারে তার পুরোনো পরিচিতি।
এসএ




Comments