Image description

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থেকে সরে আসছে সরকার। ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার মতো শর্তগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করছে না সরকার।

সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো শর্ত সরকার মেনে নেবে না। আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তি হলেও দেশের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে আগের ঋণচুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে আইএমএফ নতুন ঋণের জন্য শর্ত নির্ধারণ করবে। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার সাইডলাইনে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেই নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের কোনো নতুন ঋণচুক্তি নেই। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা ঋণচুক্তি নতুন সরকার আলোচনার মাধ্যমে বাতিল করেছে। তবে আগের ঋণের কোনো কিস্তি বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আইএমএফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার কথা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিভিন্নভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। আগস্টের শুরুতে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি না রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর ডলারের দাম কমে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়া বাজারে কারসাজির মাধ্যমে ডলারের দাম বাড়ানোর প্রবণতাও রয়েছে। এসব কারণে বাজারে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার শর্তও রয়েছে আইএমএফের। তবে আগস্টের শুরুতে নীতি সুদের হার কমানো হয়েছে। ঋণের সুদের হার কমানোর জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম নির্ধারণ এবং বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর শর্ত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও সরকার এখন পর্যন্ত কঠোরভাবে আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে না। কারণ, শর্ত অনুযায়ী দাম সমন্বয় করলে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করছে না। বর্তমানে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা অর্থ বাদ দিলে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমছে না। বরং আগের সরকারের সময়ে বিতরণ করা বিভিন্ন ঋণ খেলাপি হওয়ায় এর পরিমাণ আরও বাড়ছে। ফলে আইএমএফের শর্ত পূরণ এবং দেশের অর্থনীতিতে জনবান্ধব নীতি বজায় রাখার মধ্যে সরকারকে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইএমএফের শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলে নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা জটিল হতে পারে। তবে সরকার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করেই নতুন ঋণচুক্তির শর্ত নির্ধারণ করতে চাইছে।

এসএস