Image description

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত তিন মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩৫ কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঘটনার বেশিরভাগের পেছনে মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্কের ভূমিকা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) একদিনেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে চার কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়। নিখোঁজ কিশোরীদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে দুজনের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। অন্য দুজনের সন্ধানেও অনুসন্ধান চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজ কিশোরীদের মধ্যে স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পরিচিত বা অপরিচিত তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের পর অনেক কিশোরী বাড়ি ছাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বাড়ি ফিরতে অনীহা দেখাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার নিখোঁজ চার কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে আড়াইহাজার থানায় জিডি করেন। পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থান শনাক্ত করেছে। তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে কি না, কিংবা কোনো ধরনের চাপ বা প্রলোভনের শিকার হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোরীদের ঘর ছাড়ার ঘটনায় মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। তবে এর পাশাপাশি পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি, কিশোর বয়সের আবেগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতার অভাব এবং সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অজান্তে দীর্ঘদিন ধরে কারও সঙ্গে মুঠোফোনে কথাবার্তা চলার পর বিষয়টি প্রকাশ পায়। পারিবারিক বাধা, অভিভাবকের শাসন কিংবা সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার আশঙ্কা থেকেও কেউ কেউ বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক পরিবার সামাজিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করতে চান না। বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ পুলিশকে জানাতেও দেরি করেন।

আরেক অভিভাবক বলেন, মেয়ের বিষয় হওয়ায় অনেকে সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে ঘটনা গোপন রাখেন। এতে সমস্যা আরও বাড়ে। দ্রুত পুলিশকে জানালে অন্তত নিখোঁজ কিশোরীর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা সম্ভব হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোরীর অবস্থান শনাক্ত করার পরও সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সহজ হয় না। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কেউ কেউ অনীহা প্রকাশ করতে পারে। এ কারণে শুধু উদ্ধার নয়, কিশোরীর নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা এবং সে কোনো ধরনের চাপ, প্রলোভন বা প্রতারণার শিকার হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আড়াইহাজার থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন বলেন, গত তিন মাসে ৩৫টি নিখোঁজের জিডি হয়েছে। কোনো কিশোরী নিখোঁজ হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত থানায় যোগাযোগ করার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, নিখোঁজ কিশোরীর সাম্প্রতিক ছবি, মুঠোফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং সম্ভাব্য কোথায় যেতে পারে—এসব তথ্য পুলিশকে দিলে অনুসন্ধানে সহায়তা পাওয়া যায়।

ওসি আরও বলেন, বেশিরভাগ নিখোঁজের ঘটনায় প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসছে। অভিভাবকেরা সচেতন হলে এ ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব।

আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুর রহমান বলেন, শুধু মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া কিংবা শাসন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কিশোর-কিশোরীদের মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার এবং সমস্যা খোলামেলা জানানোর মতো পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

এসএ