Image description

চুরির সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গাছে বেঁধে মারধর ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালেও নির্যাতনের ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে ২০২৫ সালের একটি চুরির মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রায় এক মাস কারাগারে রাখা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

বর্তমানে জামিনে মুক্ত হয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় দিন কাটাচ্ছেন ওই দুই ব্যক্তি।

ঘটনাটি গত ২৬ জুলাই উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের লক্ষ্মী বিষ্ণুপ্রসাদ খলিফাপাড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী দুজন হলেন—সোহাগ খলিফা (২৭) ও বাদশা খলিফা (৪৮)।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মো. হান্নান খলিফার বাড়িতে চুরি হয়েছে—এমন অভিযোগে সোহাগ ও বাদশাকে সন্দেহ করা হয়। পরে গ্রামের মেম্বার মো. রফিক উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সোহাগের অভিযোগ, প্রথমে তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। পরে হান্নানের বাড়ির একটি ঘরে সিলিংয়ের সঙ্গে উল্টো করে বেঁধে স্টিলের পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। এমনকি লোহার প্লাস দিয়ে হাত-পায়ের কয়েকটি নখ তুলে ফেলা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

সোহাগ বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি চাল কিনে বাড়ি ফিরছিলাম। আমাকে ধরে নিয়ে মারধর করা হয়। আমি চুরি করিনি বললেও তারা আমাকে ছাড়েনি।’

সোহাগের স্ত্রী মোছা. আশা খাতুন বলেন, ‘স্বামীকে বাঁচাতে গেলে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়। এখন সে বিছানায় পড়ে আছে। চিকিৎসার টাকা নেই।’

সোহাগের মা-বাবা ঢাকায় থাকেন। ছেলের বর্তমান অবস্থা জানতে পেরে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।

সোহাগের মা বলেন, ‘আমার ছেলে অপরাধ করলে আমাদের জানানো হতো। আমরা ঢাকায় থাকি। আমাদের না জানিয়ে এভাবে মারধর করার কী দরকার ছিল? এখন ছেলে বিছানায় কাতরাচ্ছে।’

সোহাগের বাবা বলেন, ‘অপরাধ করলে পুলিশে দিত, আদালত বিচার করত। নিজেরা মারধর করবে কেন? আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’

পরিবারের দাবি, নির্যাতনের কারণে সোহাগ বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আশরাফ আলী বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে আমি পুলিশকে খবর দিই। পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। চুরির অভিযোগ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেত, কিন্তু কাউকে মারধর করার অধিকার কারও নেই।’

ঘটনার সময় পুলিশের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাওয়া রায়গঞ্জ থানার এসআই মো. মতিন বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলব।’

রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ‘৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চুরির সন্দেহে মারধরের শিকার দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। তবে এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি।’

তবে পুলিশের এ বক্তব্যের পরই তৈরি হয়েছে ঘটনার অন্যতম প্রশ্ন। ভুক্তভোগীদের দাবি, পুলিশ তাদের উদ্ধার করে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চান্দাইকোনা বাগানবাড়ি এলাকায় সংঘটিত একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।

ওই মামলায় মো. গোলাম মোস্তফার মেয়ে মোছা. তাজমহল খাতুন বাদী হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরে সোহাগ ও বাদশা প্রায় এক মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ২৬ জুলাইয়ের ঘটনায় তারা চুরির সন্দেহে নির্যাতনের শিকার হলেও পুলিশ বলছে ওই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। তাহলে তাদের কোন মামলার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হলো? ২০২৫ সালের ওই চুরির মামলার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য কী ছিল—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে হান্নান খলিফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে চুরি হয়েছে। তাই তাদের মারধর করা হয়েছে।’

চুরির ঘটনায় মামলা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা করা হয়েছে কি না, সেটা আমার বাবার কাছ থেকে জানতে হবে।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

এদিকে নির্যাতনের ঘটনায় সোহাগের শ্বশুর মো. আশরাফ আলী খলিফা গত ১১ আগস্ট সিরাজগঞ্জ জেলা আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ১০৬।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চুরির ঘটনা ঘটলে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করার সুযোগ নেই। তাদের মতে, চুরির অভিযোগের সত্যতা এবং দুই ব্যক্তিকে নির্যাতনের অভিযোগ—দুটি বিষয়ই আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

রায়গঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘গাছে বা ঘরে বেঁধে নির্যাতন করা একটি অপরাধ। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতনের শিকার দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছিল, তখন ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, তাদের শারীরিক অবস্থা এবং নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?

একদিকে পুলিশ বলছে, ওই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের উদ্ধারের পর পুরোনো একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রায় এক মাস কারাগারে রাখা হয়। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে দুজনই শারীরিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

চুরির অভিযোগ, প্রকাশ্যে নির্যাতন, ৯৯৯-এ পুলিশের উদ্ধার, থানায় মামলা না হওয়া এবং পরে পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার—ঘটনার এই ধারাবাহিকতা নিয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।

এসএ