Image description

দীর্ঘদিনের খরায় ফেটে চৌচির হয়ে আসছিল আমনখেত। ধানে ফুল আসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে বাড়ছিল সেচের ওপর নির্ভরতা। বাড়ছিল উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তাও। এমন সময়ে বুধবার ভোরের টানা বৃষ্টি যেন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বৃষ্টির পানিতে আমনখেতে ফিরেছে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা, কমেছে সেচের চাপ। ভালো ফলনের আশায় স্বস্তি ফিরেছে কৃষকের মুখে।

তবে কৃষকের সেই স্বস্তির বৃষ্টি রাজশাহী নগরে এসে রূপ নিয়েছে দুর্ভোগে। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণে নগরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি তলিয়ে যায় পানিতে। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে ব্যাহত হয় যান চলাচল। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও স্বজনসহ সাধারণ পথচারীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। ফলে একই বৃষ্টি গ্রামে কৃষকের কাছে আশীর্বাদ হলেও নগরবাসীর কাছে হয়ে ওঠে দুর্ভোগের কারণ।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ "৯৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার" বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিতে কৃষিজমিতে স্বস্তি ফিরলেও নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আমনখেতে ফিরেছে স্বস্তি

চলতি বর্ষা মৌসুমে রাজশাহীতে প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমন চাষাবাদ নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগে ছিলেন কৃষকরা। বৃষ্টির অভাবে অনেক কৃষককে জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। এতে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। পাশাপাশি ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।

এখন জেলার বিভিন্ন এলাকার আমনখেতে ধানে ফুল আসতে শুরু করেছে। এ সময় পর্যাপ্ত পানি ধানের দানা গঠন ও পরিপুষ্ট হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুধবার ও বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ফিরে আসায় ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, এ সময়ে বৃষ্টি হলে আমন ধানের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ধানে ফুল আসা ও দানা গঠনের সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া ফলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বৃষ্টির ফলে এবার বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেছে।

আগাম সবজিতেও সুফল

শুধু আমন ধান নয়, বৃষ্টিতে উপকার হয়েছে আগাম সবজি চাষেও। পবা উপজেলার কুখন্ডি এলাকার কৃষক আফজাল হোসেন ২০ বিঘা জমিতে আগাম জাতের বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষ করেছেন। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় জমির আর্দ্রতা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন তিনি।

মোশাররফ হোসেন বলেন, কয়েক দিন বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে সেচ দিতে হচ্ছিল। বুধবার ও বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে সবজির উপকার হবে। একই সঙ্গে সেচের খরচও কমবে।

নগরে এক বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা

কৃষকের মাঠ থেকে নগরে পা রাখতেই বদলে যায় বৃষ্টির চিত্র। বুধবার সকাল থেকেই রাজশাহী নগরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমতে শুরু করে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনের সড়ক, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক, বর্ণালী মোড়, হেতেমখা ও লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় ব্যাহত হয় যানবাহন চলাচল। পানিতে আটকে পড়ে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা। অনেক পথচারী বাধ্য হন নোংরা পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে। অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদেরও পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে।

বৃষ্টির তীব্রতা কমার পর নগরের অনেক এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও সকালজুড়ে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কোথাও জমে থাকা বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। জলাবদ্ধ সড়কে যানবাহন চলাচলের সময় পথচারীদের শরীরে ছিটকে পড়ে নোংরা পানি।

‘একটু বেশি বৃষ্টি হলেই পানি জমে’

বর্ণালী মোড় এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, রাজশাহীকে দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর শহর বলা হয়। কিন্তু একটু বেশি বৃষ্টি হলেই অনেক সড়কে পানি জমে যায়। তখন চলাচল করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

কলেজ শিক্ষার্থী মারিয়া ও  অনামিকা বলেন, বৃষ্টির পর রাস্তার পানি অনেক সময় ড্রেনের ময়লার সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে ক্লাসে যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব

এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন নগরবাসীর জন্য আধুনিক, বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নাগরিকবান্ধব নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, মশক নিয়ন্ত্রণ, কাদামাটি অপসারণ, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তবে বুধবার ও বৃহস্পতিবারের প্রায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা আবারও সামনে এনেছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতার বিষয়টি। কৃষকের জন্য কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি যেখানে স্বস্তি ও সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে, সেখানে একই বৃষ্টি নগরবাসীর জন্য তৈরি করেছে দুর্ভোগের নতুন অভিজ্ঞতা। নগরের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি তাই আরও জোরালো হয়েছে।

এসএ