খালেদা জিয়াকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ঘিরে
পটুয়াখালী বিএনপিতে উত্তাপ, মুখোমুখি নেতারা
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পটুয়াখালী বিএনপিতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি সেহাংশু সরকার কুট্টিকে জড়িয়ে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের পর দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সভা-সমাবেশে পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুমকীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলতাফ হোসেন চৌধুরী অভিযোগ করেন, ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার পটুয়াখালী সফরের সময় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, “ম্যাডাম বেগম খালেদা জিয়া ২০০১ সালে পটুয়াখালী এসেছিলেন নির্বাচনের জন্য। তখন একজন লোককে ঠিক করা হয়েছিল ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে হত্যা করার জন্য। এ কথা গোয়েন্দাসহ সর্বমহলে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় কাজটি করতে পারেনি। নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ায় ম্যাডাম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “এই কুট্টি সরকারই ওই লোকটাকে ইন্ডিয়ায় (ভারত) পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বহু মাস ইন্ডিয়ায় ছিল। এসব কাহিনী আপনারা জানেন না। এগুলো আমি জানি, প্রয়োজনে এগুলো বলব।”
এ সময় তিনি আরও বলেন, “আপনারা লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে আমাকে এমপি করেছেন আপনাদের কাজ করার জন্য, নাকি ঢাকায় গিয়ে বসে থাকার জন্য? আর ওরা আমাকে কী প্রস্তাব দিয়েছে জানেন? ‘আপনি ঢাকার কাজ করেন, আর এখানের চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সালিশবাজি, দখলবাজি আরাম করে করি।’”
আলতাফ হোসেন চৌধুরীর এমন বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
জেলা বিএনপির মিডিয়া সেল প্রধান কাজল খন্দকার তাঁর ফেসবুক আইডিতে লেখেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী, অতঃপর দপ্তরবিহীন মন্ত্রী, সর্বশেষে হাতছাড়া জেলা বিএনপি। ক্যারিয়ারের এই পরিণতি এমনি এমনি হয়নি। উল্টাপাল্টা বক্তব্য, অহংকার আর দাম্ভিকতা আপনাকে আজ এখানে পৌঁছে দিয়েছে।”
জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিব সানি লেখেন, “চীনের গুণগান আর কুট্টি সরকার কাকার বদনাম—এ দুটো কাজ ছাড়া যেন আর কিছুই পারে না! সংগঠনের প্রতি কোনো দরদ, দায়বদ্ধতা বা কর্মীদের প্রতি দায়িত্ববোধ আছে বলেও মনে হয় না। আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থাকলে যা হয় আরকি—মাঠের বাস্তবতা না বুঝে শুধু সমালোচনা আর আত্মপ্রচারে ব্যস্ত।”
এ লেখার নিচে মো. নিয়াজ মাহমুদ মন্তব্য করেন, “স্যার, তখন তো আপনি সরকারের সর্বোচ্চ স্থানে ছিলেন, অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তখন কেন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি? আপনি চাইলে তখন তো তাকে সর্বোচ্চ বিচারের আওতায় আনতে পারতেন। তাছাড়া আপনার বক্তব্য অনুযায়ী তো তিনি অপরাধী। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে—একজন অপরাধী কীভাবে আপনার কাছে রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়? আমি যতটুকু জানি, সেহাংশু সরকার কুট্টি দা একসময় আপনার খুব কাছের মানুষ ছিলেন।”
তবে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য দেখা গেছে। মো. তুহিন মৃধা মন্তব্য করেন, “আলতাফ চৌধুরী স্যার সত্যি কথা বলে।” অন্যদিকে এন.সি.ডি নিতু লিখেছেন, “এ রকমের মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে রাজনীতি হয় না।”
এদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে পটুয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে জেলা বিএনপি আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন দলের কয়েকজন নেতা।
অনুষ্ঠানে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন নান্নু বলেন, “আলতাফ চৌধুরী যা বলেছেন, এটা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এ জন্যই সংসদে উনাকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। কী দিয়ে আবার কী বলে ফেলেন! তাই আমি বলব, উনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁর প্রমাণ দিতে হবে। আর যদি প্রমাণ দিতে না পারেন, তাহলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ না রাখার জন্য আমি তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করব।”
পৌর বিএনপির স্থগিত কমিটির সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, “পাবলিক প্লেসে কী কথা বলতে হয়, তাও আপনারা শিখেননি। দয়া করে এ দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য পাবলিক প্লেসে আর কোনো কথা আমরা শুনতে চাই না। তাই আমি কঠিন বার্তা দিতে চাই—তারা জেলা বিএনপি বা সংসদ সদস্য বা কেন্দ্রীয় বিএনপি, আপনারা যে-ই থাকেন না কেন, দলকে পাবলিক প্লেসে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ওপরস্থ কমিটি আছে, কেন্দ্রীয় বিএনপি। আপনারা সেখানে গিয়ে নালিশ করুন। কার বিরুদ্ধে কে কথা বলবেন, সেখানে গিয়ে বলবেন। কিন্তু দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য মাঠপর্যায়ে কাউকে ছোট করবেন না। আপনাদের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করব, আপনারা এই দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।”
জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৌফিক আলী খান কবির বলেন, “আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য সাহেব যেহেতু একটি কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে প্রমাণ আছে কি না, আমি জানি না। আমিও ফেসবুকে বক্তব্যটি শুনেছি। তাঁর কাছে প্রমাণ থাকলে তো অবশ্যই এটা সত্য। আর এ বক্তব্য নিয়ে এখন যা কিছু হচ্ছে, তাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ১৭ বছর পর দল ক্ষমতায় এসেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা আসলে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং কাদা ছোড়াছুড়ি দৃষ্টিকটু।”
জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ সরোয়ার কালাম বলেন, “অনেক ত্যাগ ও আন্দোলন-সংগ্রামের ১৭ বছর পর দল ক্ষমতায় এসেছে। এখন দল ও দেশকে নিয়ে ভাবনার সময়। দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি নয়। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আলতাফ চৌধুরী সাহেব শুধু দলের এমপিই নন, তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যানও। তাঁকে ও তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে ইতোমধ্যে তারাই আপত্তিকর কথাবার্তা বলেছেন এবং মূলত তারাই ব্যক্তি সমালোচনার রাজনৈতিক কালচার শুরু করেন। এই রাজনীতি থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।”
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মজিবুর রহমান টোটন বলেন, “২০০১ সালে ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে পটুয়াখালীতে হত্যার পরিকল্পনার তথ্য যদি তাঁর কাছে থাকে, তাহলে উনি তো সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। তখন তিনি কুট্টি সরকারকে আইনের আওতায় আনেননি কেন? উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে সভাপতি এবং কুট্টি সরকারকে সেক্রেটারি বানিয়েছেন কেন? যে ব্যক্তি খালেদা জিয়াকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, তাঁকে উনি সেক্রেটারি বানালেন কেন?”
তিনি আরও বলেন, “এই ২৬ বছরে একবার উচ্চারণ করেননি, এখন কেন এ কথা বললেন? এ বক্তব্যের কি প্রমাণ আছে? উনি যদি প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে আমি তো কুট্টি সরকারের বিএনপি করতে পারি না। আর যদি উনি প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি নিজে কী করবেন, সেটা তাঁর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।”
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সেহাংশু সরকার কুট্টির বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি “নো কমেন্ট” বলে মন্তব্য করেননি।
এসএ




Comments