Image description

আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন আরও সঠিকভাবে তুলে ধরতে প্রচলিত ‘মার্কেটর’ মানচিত্রের পরিবর্তে নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব উঠেছে জাতিসংঘে। শুক্রবার এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোগোর উদ্যোগে আনা একটি প্রস্তাবে প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্র ধীরে ধীরে বাদ দিয়ে আফ্রিকার আয়তন আরও সঠিকভাবে তুলে ধরা ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি টোগোর পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের অপর ৫৪ সদস্যরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে মোট কতটি দেশ সমর্থন করছে, তা তিনি উল্লেখ করেননি।

ডুসি বলেন, “এই আলোচনা রাজনৈতিক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আলোচনা। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, তাই আমাদের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।”

জাতিসংঘের প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রস্তাবটি পাস হলে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনে মার্কেটর প্রজেকশনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে নৌপথে নাবিকদের দিকনির্দেশনার সুবিধার জন্য এই মানচিত্র তৈরি করেন। প্রায় পাঁচ শতাব্দী পরও এটি বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত মানচিত্র প্রক্ষেপণ হিসেবে রয়েছে।

তবে মার্কেটর প্রজেকশনের কারণে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো প্রকৃত আয়তনের তুলনায় ছোট এবং উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বড় দেখায়। এর ফলে আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের কাছাকাছি আয়তনের মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।

আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরতে ‘#CorrectTheMap’ প্রচারণায় ২০১৮ সালে তৈরি ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ প্রচারণার একটি আবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো ও ইউরোপের বড় একটি অংশ জায়গা পাওয়ার পরও অতিরিক্ত ভূমি অবশিষ্ট থাকবে। আবেদনটিতে ১১ হাজারের বেশি স্বাক্ষর রয়েছে।

আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০২৫ সালের আগস্টে এই প্রচারণার প্রতি সমর্থন জানায় এবং পরে টোগোকে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব দেয়।

ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মার্কেটর প্রজেকশন পশ্চিমা ধ্যানধারণার সঙ্গে যুক্ত। কিছু অধিকারকর্মী এ প্রবণতাকে ‘কার্টোগ্রাফিক ঔপনিবেশিকতা’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

মার্কেটর মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ১৯৭৩ সালে জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স ‘পিটার্স বিশ্ব মানচিত্র’ চালু করেন, যা গল-পিটার্স প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের লন্ডনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সহযোগী জে জে এনকও মনে করেন, মার্কেটর প্রজেকশন আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে দৃশ্যত ছোট করে দেখায়। তার মতে, সমান-আয়তনের মানচিত্র গ্রহণ করলে শিক্ষা ও জনসাধারণের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে আরও নির্ভুল ভিত্তি তৈরি হবে এবং আফ্রিকার জনমিতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণাও পরিবর্তিত হতে পারে।

টোগোর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ভোটটি আফ্রিকান ইউনিয়ন-সমর্থিত আরেকটি প্রস্তাবের মতো সফল হবে। চলতি বছরের মার্চে দাসব্যবসাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘানা-উত্থাপিত একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে ১২৩ ভোটে পাস হয়। তিনটি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

টোগো সরকার আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির রাজধানী লোমেতে ইউনেস্কো, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও গুগলসহ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে। সেখানে প্রস্তাবটি পাস হলে এর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে।

ডুসি বলেন, “যারা বলছেন, এখন কেন—তাদের বলি, কেন নয়? বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে সময় এসেছে আমাদের বর্ণনা পরিবর্তনের।”

তিনি আরও বলেন, “আফ্রিকায় নিজেদের যে পরিবর্তন আমরা করতে পারি, সেটির দায়িত্ব নিজেদের নেওয়ার সময় এসেছে।”

সূত্র: The Guardian

এনএ