বড়গাছি স্কুলে বদলের হাওয়া, বখাটেদের আড্ডা বন্ধে কঠোরতা
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় নানা উদ্যোগ; আইডি কার্ড, অভিযোগ বক্স ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট হাজিরার উদ্যোগ
একসময় বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে বখাটেদের আড্ডা, শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা কিংবা ধূমপানের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় উদ্বেগে থাকতেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়ায় রাজশাহীর পবা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ফিরছে স্বস্তি—এমনটাই দাবি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের।
গভর্নিং বডির সভাপতি কে এইচ রানা শেখের নেতৃত্বে প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ঠেকানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।
বখাটেদের আড্ডা বন্ধে কঠোর অবস্থান
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাচীরসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় ও বহিরাগত বখাটেদের আড্ডা বসত। শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা, ধূমপানসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও ছিল। এতে বিশেষ করে ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বর্তমানে বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ও বখাটেপনা ঠেকাতে প্রশাসন ও শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যালয় এলাকায় আগের তুলনায় শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, পরামর্শ কিংবা সমস্যার কথা সরাসরি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে অভিযোগ বক্স। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নজরে আনা এবং প্রয়োজন হলে ওই শিক্ষার্থী কিংবা তার অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি শিক্ষকদের উপস্থিতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে। এবার শিক্ষার্থীদেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট হাজিরা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গভর্নিং বডির সভাপতি।
এ ছাড়া শিক্ষার পরিবেশ ও নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নেও নজর
শুধু নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে আলাদাভাবে পাঠদান করা হচ্ছে। নিয়মিত পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছেন গভর্নিং বডির সভাপতি কে এইচ রানা শেখ। তিনি নিজ উদ্যোগে কলেজ শাখায় ১৫টি চেয়ার ও একটি পানির মোটর দিয়েছেন। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও সহজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে নিয়মিত কাজ করছি’
বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জেকের আলী বলেন, ‘শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে আমরা নিয়মিতভাবে কাজ করছি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত ক্লাস করতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ফলাফল ও শিক্ষার মান আরও উন্নত করতে আমরা পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে চাই।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীমা খাতুন বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক ভালো। আমরা নিরাপদে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে পারছি। পড়াশোনার পরিবেশও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। শিক্ষকরা ক্লাসে নিয়মিত থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে আমাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।’
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া আক্তার ইমি বলেন, ‘বিদ্যালয়ের সামনে বখাটেদের আড্ডা বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো বিষয় এখন আগের তুলনায় অনেক কমেছে। নিরাপত্তা বাড়ায় আমরা স্বস্তিতে বিদ্যালয়ে আসতে পারছি। আগে অনেক সময় নানা কারণে অস্বস্তি লাগত, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ায় পড়াশোনায় মনোযোগও বেড়েছে।’
‘বড়গাছিকে বিভাগের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান করতে চাই’
গভর্নিং বডির সভাপতি কে এইচ রানা শেখ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড যাতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা কঠোরভাবে কাজ করছি।’
তিনি বলেন, বখাটেপনা ও বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট হাজিরা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কে এইচ রানা শেখ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো একটি প্রতিষ্ঠান হওয়া নয়, বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজকে রাজশাহী বিভাগের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নে সহযোগিতার আশ্বাস
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, ‘একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং পাঠদানের মান নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল হক মিলন বলেন, ‘বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে আমি সার্বিক সহযোগিতা করব। আমার নির্বাচনী এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আধুনিক, নিরাপদ ও সময়োপযোগী শিক্ষাদানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তারাই ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, উদ্যোগগুলো যেন অব্যাহত থাকে
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ে। তাই বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া উদ্যোগগুলো সাময়িকভাবে নয়, নিয়মিতভাবে অব্যাহত রাখার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং সর্বোপরি নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।
বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটি পবার গণ্ডি পেরিয়ে রাজশাহী বিভাগের একটি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয়দের।
এসএ




Comments