ভিডিও কলেই শেষ বিদায়
কফিন হয়ে দেশে ফিরলেন নাছির, বাবার অপেক্ষায় যমজ সন্তান
জন্মের পর থেকেই অবুঝ দুই শিশুর কাছে বাবার পরিচয় ছিল মুঠোফোনের পর্দায় দেখা একটি মুখ। সাত মাস বয়সী যমজ সন্তান আদনান ও নুসাইবা জানত না, তাদের বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় মরুভূমির দেশে ঘাম ঝরাচ্ছেন বাবা। সেই অপেক্ষার অবসান হলো ঠিকই, তবে বাবা ফিরলেন কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে—নিথর, নির্বাক।
সৌদি আরবে সড়ক নির্মাণকাজে রোড রোলারের চাপায় নিহত টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কুতুবপুর আদর্শ গ্রামের যুবক নাছির হোসেনের (২৫) মরদেহ অবশেষে নিজ বাড়িতে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার পর বাড়ির উঠোনে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন থামতেই কান্নার রোল পড়ে যায় পুরো গ্রামে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকান চালানো বাবা শফিকুল ইসলাম ছয় বছর আগে ধারদেনা করে একমাত্র ছেলে নাছিরকে সৌদি আরবে পাঠান। সংসারের অভাব ঘুচিয়ে সচ্ছলতার মুখ দেখতে নাছিরও দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন।
সম্প্রতি ছুটিতে দেশে এসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পর স্ত্রী আছিয়া খাতুনের কোলজুড়ে আসে যমজ সন্তান। নতুন অতিথির আগমনে প্রবাসে থাকা নাছিরের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু সন্তানদের চোখে দেখার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি তার। প্রতিদিন ভিডিও কলের মাধ্যমে সন্তানদের আদর করতেন এবং দিন গুনতেন—কবে দেশে ফিরে দুই সন্তানকে দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরবেন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টার দিকে সৌদি আরবে সড়ক নির্মাণকাজ করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন নাছির। রোড রোলারের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ছেলের কফিনের পাশে বসে ডুকরে কেঁদে ওঠেন বাবা শফিকুল ইসলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “পরিবারের সুখের মুখ দেখার আশায় কত কষ্ট করে একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। আজ নিজের হাতে সেই ছেলেকে মাটিতে শুইয়ে দিতে হলো। আমি আজ পুরোপুরি নিঃস্ব।”
নাছিরের উপার্জনেই সচল ছিল সংসারের চাকা। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, অন্ধকার নেমে এসেছে বৃদ্ধ বাবা-মা, সদ্য মা হওয়া স্ত্রী এবং অবুঝ দুই শিশুর জীবনে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রাত ১১টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নাছিরকে দাফন করা হয়। চারপাশের কান্নার রোল ও শোকাবহ পরিবেশের মধ্যেও সাত মাস বয়সী দুই শিশু তখনও বুঝে উঠতে পারেনি—ভিডিও কলের ওপাশ থেকে তাদের হাসানোর মানুষটি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
ডিআর




Comments