দক্ষিণ চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার চালুর এক বছরের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এ চিকিৎসাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, সেবাগ্রহীতা এবং কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
প্রকল্পের মেয়াদ নবায়ন না হওয়ায় গত ১ আগস্ট থেকে ট্রমা সেন্টারে কোনো চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন না। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরীর আশ্বাসে কয়েকজন নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় দেড় মাস বিনা বেতনে হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গেলেও গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সেই সেবাও বন্ধ করে দিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় আহতদের অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান। এ বাস্তবতায় মহাসড়কের পাশে লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার। একই বছরের ২৯ আগস্ট সেন্টারটি উদ্বোধন করা হলেও জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন একদিনের জন্যও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি।
পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের (সিআইএমসি) যৌথ উদ্যোগে ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারটি চালু করা হয়। চালুর পর এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত প্রায় ১২ হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী এখানে চিকিৎসা নিতেন। পাশাপাশি ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করা হতো।
সিআইএমসির পক্ষ থেকে ট্রমা সেন্টারে ছয়জন চিকিৎসক এবং ১৫ জন নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত ছিলেন। চলতি বছরের ৩১ জুলাই সরকারের সঙ্গে সিআইএমসির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় বর্তমানে ট্রমা সেন্টারের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ড্রেসিং করাতে ট্রমা সেন্টারে এসেছিলাম। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় এখন সেবা পাচ্ছি না। চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় আমি হতাশ।’
ট্রমা সেন্টারে কর্মরত এইচ আর শহীদ বলেন, ‘ট্রমা সেন্টারটি চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় ১২ হাজার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ট্রমা সেন্টার পরিদর্শনে এসে যেকোনো মূল্যে এটি চালু রাখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, চিকিৎসক, ওষুধপত্রসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় আমরা হতাশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় এমপি সাহেবের আশ্বাসে ট্রমা সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগস্ট মাসে বিনা বেতনে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সাড়া না পাওয়ায় বর্তমানে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টারটি চালুর পর আহত রোগীরা ভালো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছিলেন। ওই সময় প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা খরচ করে সেন্টারটি চালু করা হয়। এর মধ্যে সরকার ৭৯ লাখ টাকা দিয়েছিল। পরবর্তী অর্থবছরের বরাদ্দে বাকি টাকা সমন্বয় করার কথা ছিল। কিন্তু সরকার পরবর্তী সময়ের জন্য নতুন করে চুক্তি নবায়ন করছে না। ফলে ট্রমা সেন্টারটি বন্ধ হয়ে গেছে।’
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিষয়টি অবহিত করেছি। ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত চালু করার জন্য চেষ্টা করছি।’
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল্লাহ আল ইফরান বলেন, ‘চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রমা সেন্টারটি পুনরায় চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।’
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ট্রমা সেন্টারটি চালু রাখার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘ট্রমা সেন্টার চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই ট্রমা সেন্টারটি আবার চালু হবে।’
এসএ




Comments