মতলব উত্তরে লাল শাপলার বিলে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা
ভোরের আলোয় লাল শাপলার রাজ্য, বিলে প্রকৃতির লাল-সবুজের মায়া
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে নীরবতা, বাতাসে বর্ষার স্নিগ্ধ পরশ। এরই মধ্যে বিলের শান্ত পানিতে সবুজ পাতার ফাঁক গলে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা যেন জানান দিচ্ছিল নতুন দিনের আগমনী বার্তা। সকালের নরম আলোয় লাল পাপড়ি আর সবুজ পাতার মেলবন্ধনে জলাশয়জুড়ে তৈরি হয়েছে লাল-সবুজের অপূর্ব এক দৃশ্য।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভাধীন বারোয়ানি গ্রামের বিলে এখন এমনই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। বর্ষার মৌসুমে বিলজুড়ে ফুটেছে অসংখ্য লাল শাপলা। ভোরে একসঙ্গে হাজারো শাপলা প্রস্ফুটিত হওয়ায় দূর থেকে পুরো জলাশয়টিকে মনে হয়, সবুজের বুকে কেউ যেন এঁকে দিয়েছে বাংলাদেশের পতাকার প্রতিচ্ছবি।
ভোর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে শাপলার সৌন্দর্য। হালকা বাতাসে পানির ওপর দুলতে থাকা ফুলগুলো যেন মৃদু হাসছে। কোথাও পাশাপাশি ফুটে আছে একগুচ্ছ শাপলা, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ সবুজ পাতার চাদরের মাঝখান থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে লাল ফুল। পাতার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দু সকালের আলোয় চিকচিক করে ওঠে মুক্তোর মতো।
শুধু শাপলা নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে গ্রামের চিরচেনা প্রকৃতিও। শান্ত জলরাশি, ভেজা মাটি, স্নিগ্ধ বাতাস আর চারপাশের সবুজে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক মায়াবী পরিবেশ। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।
তবে শাপলার এই সৌন্দর্য উপভোগের রয়েছে নির্দিষ্ট সময়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রতিদিন ভোরে ফুলগুলো পূর্ণ বিকশিত হয়। সূর্যের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পাপড়ি গুটিয়ে নেয় শাপলা। তাই সূর্য ওঠার আগের সময়টিই এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
মতলব দক্ষিণ থেকে শাপলা দেখতে আসা জাহিদ মিয়া বলেন, “এখানে লাল শাপলা ফুটেছে জানতে পেরে দেখতে এসেছি। সকালে এসে দৃশ্যটি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ভোরে আরও আগে আসতে পারলে ভালো লাগত।”
মোহনপুর থেকে আসা নববধূ ফারজানা তাবাসসুম ইতি বলেন, “লাল শাপলা সচরাচর দেখা যায় না। এ কারণে দর্শনার্থীদের আকর্ষণও বেশি। তবে সৌন্দর্য রক্ষায় কেউ যাতে ফুল না তোলে, সে জন্য সাইনবোর্ড দেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করা দরকার।”
টরকি থেকে আসা জাফর বলেন, “সকালে এত লাল শাপলা দেখে মনটা জুড়িয়ে গেল। আমাদের উপজেলার মধ্যে এতগুলো লাল শাপলা একসঙ্গে আগে দেখিনি। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন উদ্যোগ নিলে জায়গাটি পর্যটনের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদির বলেন, “ফজরের নামাজের পর বিলে অগণিত শাপলা ফুটে থাকতে দেখতে খুব ভালো লাগে। ফুলগুলো আমাদের এলাকার সৌন্দর্যের অংশ। সবাই সচেতন থাকলে এই সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব।”
উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক রহমত উল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা হলেও একসময় দেশের বিল-ঝিল, খাল-বিল ও বিভিন্ন জলাশয়ে নানা প্রজাতির শাপলা-পদ্মের সমারোহ দেখা যেত। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাট এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এসব জলজ উদ্ভিদের বিস্তৃতি দিন দিন কমছে। জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।”
প্রকৃতির এই শাপলা-সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জলজ জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য। তাই বারোয়ানি গ্রামের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজন ফুল না তোলা, জলাশয় দূষণ না করা এবং দর্শনার্থীদের সচেতন করার উদ্যোগ। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে শাপলায় ভরা এই বিলটি হয়ে উঠতে পারে মতলবের অন্যতম নান্দনিক প্রাকৃতিক আকর্ষণ।
এসএ




Comments