ফটকি নদী পুনরুদ্ধারে ফিরছে প্রাণ: মাগুরায় দুই দিনব্যাপী সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, জলাভূমি ও দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মাগুরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions-NbS) বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ফটকি নদী, কানুদার খাল ও নবগঙ্গা নদীর নির্বাচিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক, মৎস্য কর্মকর্তা, কমিউনিটি-বেইজড অর্গানাইজেশন (CBO) ও যুব প্রতিনিধিরা।
১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর মাগুরায় অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান কীভাবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাপনা করা যায়—সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ের অংশীজনদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীরা ফটকি নদীর পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ও মাছের অভয়াশ্রম পরিদর্শন করেন। সরেজমিনে তাঁরা নদীর জলপ্রবাহ, জলধারণ ক্ষমতা, মাছের আবাসস্থল এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নদীর অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনেন।
৬ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন, বাড়ছে পানি ধারণক্ষমতা
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় ফটকি নদীর প্রায় ৬ কিলোমিটার পুনঃখনন ও পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নদীর জলধারণ ও জলপ্রবাহের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতায়, পুনঃখননের পর বিভিন্ন স্থানে পানির প্রবাহ ও জলধারণ ক্ষমতা বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে পৃষ্ঠস্থ পানির প্রাপ্যতাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের কেউ কেউ নদীতে স্বরপুটি, রয়না, বাছা, পাবদাসহ কমে যাওয়া কিছু দেশীয় মাছের পুনরাগমনের কথাও জানিয়েছেন। তবে এসব তথ্য এখনো মূলত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পর্যবেক্ষণনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নদী রক্ষায় নতুন করে শঙ্কাও
নদী পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি স্থানীয়রা তুলে ধরেছেন বেশ কিছু উদ্বেগের কথাও। তাঁদের মতে, নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা, নদী ও নদীর আশপাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কচুরিপানার অবাধ বিস্তারের কারণে কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
প্রশিক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়, শুধু নদী পুনঃখনন করলেই প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান সম্পূর্ণ হয় না। নদীর প্রাকৃতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল সংরক্ষণ, নদীতীরে বনায়ন, ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ, দূষণ ও দখল রোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের সামনে উঠে আসে নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার গভীর সম্পর্কের চিত্র। আলোচনায় বলা হয়, একটি নদী কেবল পানিপ্রবাহের পথ নয়; এটি একই সঙ্গে জল, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, খাদ্য ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি socio-ecological system।
ফটকি নদীকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে এক সময়ের দেশীয় মাছের প্রাচুর্য, নৌচলাচল এবং মাছ ধরার ওপর মানুষের ব্যাপক নির্ভরতার চিত্র। ফলে নদী পুনরুদ্ধারের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
প্রশিক্ষণে Locally Led Adaptation (LLA)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমস্যা চিহ্নিতকরণ, স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি ও সমতা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া NbS বাস্তবায়নে জলবায়ু ঝুঁকি, ঝুঁকিপ্রবণতা মূল্যায়ন, ঝুঁকি প্রশমন, শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, যোগাযোগ, জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও আলোচনা ও ব্যবহারিক অনুশীলন হয়।
দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের জন্য ছিল বিশেষ নির্দেশনা। কোনো প্রকৃতি-ভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্পের সুফল, পরিবর্তন, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীরা মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে NbS-এর বিভিন্ন standard ও criteria-এর সঙ্গে বাস্তব উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করেন। দলীয় কার্যক্রম ও উপস্থাপনার মাধ্যমে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব, অন্তর্ভুক্তি এবং ecological benefits আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা করেন।
প্রশিক্ষণে তিনজন প্রশিক্ষক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা হলেন Mr. Md. Anisur Rahman, IUCN Consultant; Mr. Md. Tareq Aziz, Programme Officer, IUCN Bangladesh এবং Ms. Kazi Zenifar Azmiri, Programme Associate, IUCN Bangladesh।
সুইডেন দূতাবাস (SIDA), বাংলাদেশের অর্থায়নে CNRS-এর নেতৃত্বে IUCN, BELA, North South University (NSU), CEDIO ও PRERONA-এর অংশীদারত্বে শ্যামনগর, দাকোপ, কয়রা ও মাগুরায় বাস্তবায়িত হচ্ছে “Biodiversity for Resilient Livelihoods (B4RL) in the Modified Ganges Delta of Bangladesh” প্রকল্প।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিক, মৎস্য কর্মকর্তা, CBO ও যুব প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বিষয়ে জ্ঞান ও মাঠপর্যায়ে তা পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন এবং দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি ফটকি নদীর মতো স্থানীয় নদী-খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জনগোষ্ঠীর সহনশীল জীবিকা গড়ে তুলতে প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ডিআর




Comments