প্রতিষ্ঠার ২০ বছর অতিবাহিত হলেও তিন লাখের বেশি জনসংখ্যার লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলাকে এখনো পৌরসভা ঘোষণা করা হয়নি। এতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ, ক্ষোভ ও অসন্তোষ। উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকায় জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত কার্যক্রম বাড়লেও নাগরিক সেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কমলনগরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
আধুনিক ও নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন পৌরসভা গড়ে তোলার দাবিতে স্থানীয় জনগণ, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাবি জানিয়ে আসছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কমলনগর উপজেলা এখন আর আগের মতো শুধু গ্রামীণ জনপদ নয়। উপজেলা সদরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জমজমাট বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস ও আবাসিক এলাকা। প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপজেলা সদরে আসেন। ফলে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক নাগরিক সেবার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়লেও পৌরসভা ঘোষণা না হওয়ায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ক্ষোভ ও অসন্তোষও বাড়ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, লক্ষ্মীপুর, রায়পুর, রামগঞ্জ ও রামগতিতে পৌরসভা থাকলেও কমলনগর উপজেলায় এখনো কোনো পৌরসভা নেই। পৌরসভা হলে সড়কব্যবস্থা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পরিচ্ছন্নতা, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের প্রচেষ্টায় ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির ৯৩তম সভায় লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলাকে বিভাজন করে ‘কমলনগর’ নামে দেশের ৪৭২তম উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। ২০০৬ সালের ৬ জুন কমলনগর উপজেলা অনুমোদন পায়। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে উপজেলার উদ্বোধন করেন।
২০২১ সালের দিকে কমলনগর উপজেলা সদর দপ্তর হাজিরহাট, চরলরেন্স, চরকাদিরা, সাহেবেরহাট ও চরফলকন ইউনিয়নের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা নিয়ে পৌরসভা গঠনের বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একটি রূপরেখা (প্রস্তাব) তৈরি করা হয়। নয়টি ইউনিয়ন ও ৮১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কমলনগর উপজেলায় জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখের বেশি।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো এলাকাকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করতে হলে সাধারণত ওই এলাকায় ন্যূনতম ৫০ হাজার মানুষের বসবাস থাকতে হয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে কমপক্ষে দুই হাজার মানুষের বসবাসের বিধান রয়েছে। এলাকাটিকে শহর বা শহরতলির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে। অর্থাৎ অধিকাংশ জনগণ কৃষির বাইরে ব্যবসা, শিল্প, চাকরি বা অন্যান্য অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে। সাধারণভাবে মোট জমির অন্তত ৭০ শতাংশ অকৃষি কাজে ব্যবহৃত হতে হবে এবং কৃষিজমির পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। পাশাপাশি সড়ক, ড্রেনেজ, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা থাকতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, পৌরসভা গঠনের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলেও কমলনগরকে এখনো পৌরসভায় রূপান্তর করা হয়নি। এ কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে।
স্থানীয় অন্তত ১০ জন বাসিন্দা জানান, উপজেলা সদর হাজিরহাট, চরলরেন্স ও চরফলকন ইউনিয়নকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যাপক নগরায়ণ ঘটেছে। পৌরসভা ঘোষণা করা হলে এখানকার রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন সহজ হবে। মেঘনা উপকূলীয় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও স্থানীয় অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তাঁরা আরও বলেন, পৌরসভা গঠনের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ওই অঞ্চলের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত ভিত্তি উন্নত করা জরুরি। বর্তমানে কমলনগরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের মতো বড় মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। রয়েছে মেঘনার তীরে বিশাল পর্যটন এলাকা। প্রতিদিন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী মেঘনা বিচ দেখতে ছুটে আসেন। এ অঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে আরও শক্তিশালী করতে রাস্তাঘাট ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে একটি পৌরসভা গঠনের জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) উপজেলা সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন জুয়েল বলেন, “শুধু পৌরসভা ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পৌরসভা গঠনের আগে সম্ভাব্য এলাকার সীমানা নির্ধারণ, জনসংখ্যা, আয়-ব্যয়ের সক্ষমতা, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতা যাচাইসহ প্রয়োজনীয় সরকারি শর্ত পূরণ করতে হবে। এরপর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে পৌরসভা গঠন করা হলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।”
কমলনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, “বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের হাত ধরে ২০০৬ সালে কমলনগর উপজেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আমরা বিশ্বাস করি, এবারও তাঁর নেতৃত্বে কমলনগর পৌরসভা ঘোষণা হবে।”
কমলনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. দিদার হোসেন বলেন, “পার্শ্ববর্তী রামগতি উপজেলায় একটি পৌরসভা থাকলেও কমলনগরে পৌরসভা নেই। ফলে সমপরিমাণ জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কমলনগর নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছে।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা কমলনগরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছি। প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা সহজ করার পাশাপাশি উপজেলা সদরকে শহরে রূপান্তরিত করার জন্য পৌরসভা ঘোষণা করা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার, জনপ্রশাসন, সংস্থাপন, আইন, ভূমি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে কমলনগরকে পৌরসভা ঘোষণার উদ্যোগ নিতে হবে।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, “কমলনগরকে পৌরসভা ঘোষণার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানিয়ে আসলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি আমি পাইনি।”
জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, “বর্তমান সরকার নাগরিক সেবা সহজ করতে বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে কমলনগরকে পৌরসভা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের হাত ধরে কমলনগর উপজেলা গঠিত হয়েছে। আশা করি, পৌরসভাও এ সরকারের আমলেই হবে।”
এসএ




Comments