পলিথিনে মোড়া টিনের ঘরে বৃদ্ধ স্কুল দপ্তরী দম্পতির জীবনযুদ্ধ
‘পেটের ভাত জোগাতেই কষ্ট হয়, ঘর ঠিক করব কী দিয়ে?’
একটি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজিয়ে শত শত শিক্ষার্থীকে ক্লাসের সময় জানিয়েছেন, স্কুল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রেখেছেন, শিক্ষকদের সহযোগিতা করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই স্কুল দপ্তরীর নিজের জীবনই এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। অভাবের কষ্টে কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী।
জীবনের পড়ন্ত বেলায় যেখানে একটু শান্তি ও নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, সেখানে নড়বড়ে টিনের বেড়া ও ভাঙাচোরা ঘরই তাঁদের ঠিকানা। টিনের ছাউনির বিভিন্ন জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। সেই ফাঁক দিয়ে দিনে সূর্যের আলো আর রাতে চাঁদ-তারার আলো ঘরে ঢোকে। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ফুটো জায়গাগুলোতে দেওয়া হয়েছে পলিথিন।
এভাবেই সীমাহীন কষ্ট ও অভাবের মধ্যে লাকসাম উপজেলার মুদাফরগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের বড় বাউরতলা গ্রামের মালি পাড়ায় জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছেন হতদরিদ্র বৃদ্ধ দম্পতি বীরন্দ্র কুমার ভৌমিক (৬৬) ও রেখা রানী (৫৮)।
জানা যায়, বড় বাউরতলা গ্রামের মৃত যামিনী কুমার ভৌমিকের ছেলে বীরন্দ্র কুমার ভৌমিক ১৯৬০ সালে নিজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয়রা সহজ-সরল মানুষটিকে ‘বিরুদা’ নামে চেনেন। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি মুদাফরগঞ্জ আলী নোয়াব উচ্চ বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর কাজ করেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নাম মুদাফরগঞ্জ আলী নোয়াব স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
চাকরিজীবনে তাঁর মাসিক সম্মানী বা বেতন ছিল সাড়ে ৯ হাজার টাকা। ২০২০ সালে অবসরে যাওয়ার পরও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিকভাবে বর্তমানে পিয়নের কাজ করছেন তিনি। এ কাজ করে মাসে ৭ হাজার টাকা পান।
কথা বলে জানা গেছে, বীরন্দ্র কুমার ভৌমিক ও রেখা রানীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের বিয়ে হয়েছে এবং তাঁরা নিজ নিজ পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন। তাঁরাও দিনমজুরের কাজ করেন এবং নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। মাঝেমধ্যে বাবা-মাকে দেখতে আসেন তাঁরা।
বৃদ্ধ দম্পতির ছয় শতাংশ ভিটেমাটি থাকলেও সেখানে বসবাসের উপযোগী কোনো ঘর নেই। জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরেই তাঁদের বসবাস। বৃষ্টির সময় ছাউনি দিয়ে পানি পড়লেও বাধ্য হয়েই সেই ঘরে থাকতে হয় তাঁদের।
বৃদ্ধ বীরন্দ্র কুমার ভৌমিক (বিরুদা) বলেন, “বাবুরে, বৃষ্টি অইলে পানি হড়ে আগে ঘরে। তখন ঘরে থাহার কোনো উপায় থাহে না। কোমরে দুক্কু (ব্যথা), স্কুলের দপ্তরির চাকরি ঠিকমতো করতে হারিনা। কানে হুনি কম ও চোখে কম দেই। এখন শরীরডা আর সায় দেই না। পেটের ভাত জুডাইতেই কষ্ট হয়, ঘর ঠিক করুমু কি দিয়া?”
তাঁর স্ত্রী রেখা রানী বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। আগে কাজ করে চলতে পারলেও এখন বৃদ্ধ বয়সে তেমন কাজ করতে পারি না। তারপরও অসুস্থ শরীর নিয়ে সংসারের কাজ করি। রাইতে ঝড় হলে চিন্তা করি, এই বুঝি ঘরটা উড়াইয়া গেল। ভয়ে স্বামীকে নিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকি। বৃষ্টি হলেই টিনের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে শরীরে।”
তিনি আরও বলেন, “স্বামী স্কুলে চাকরি করে প্রতিদিন ২৩৩ টাকা পায়। মন চাইলে ভালো খাবারও মুখে দিতে পারি না। ঘর, চিকিৎসা, খাবার—কিছুই তো মেলে না। বয়স্ক ভাতা ও সরকারি কোনো সহায়তাও পাচ্ছি না।”
মুদাফরগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য রবিউল আলম বলেন, “হতদরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব। আমিও এই বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর নিদারুণ কষ্ট দেখেছি। একটি ঘর ও চলার মতো সহায়তা এখন তাঁদের জরুরি প্রয়োজন। যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এলে এমন হতদরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সহজ হবে।”
স্থানীয়রা জানান, মুদাফরগঞ্জ আলী নোয়াব স্কুলের দপ্তরি বীরন্দ্র কুমার ভৌমিক ওরফে বিরুদা দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীকে নিয়ে জরাজীর্ণ একটি ঘরে কষ্টে জীবনযাপন করছেন। ভিটেমাটি ছাড়া তাঁদের আর কোনো জমিজমা নেই।
এ বিষয়ে লাকসাম উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জান্নাতুল ফাতেমা চৌধুরী বলেন, “উপজেলায় পাঁচ দিন আগে যোগদান করেছি। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা অবশ্যই বয়স্ক ভাতার আওতায় আসবেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসএ




Comments