আনোয়ারায় ৩ মাসে ৪০ ডেঙ্গু রোগী, পরীক্ষার লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল আনোয়ারায় ধীরে ধীরে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত তিন মাসে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১৩, আগস্টে ২২ এবং সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত আরও পাঁচজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মশক নিধন, জমে থাকা পানি অপসারণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিনই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে রোগীদের।
শুধু ডেঙ্গু পরীক্ষা নয়, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় হাসপাতালের অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রমেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তিনটি টেকনোলজিস্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। বাকি দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভোগা এক রোগী চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কখন তাঁর সিরিয়াল আসবে, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তবে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, জুলাই মাসে আনোয়ারায় ১৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সাতজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। আগস্টে ২২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং আটজনকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত আরও পাঁচজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
আনোয়ারার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী চন্দনাইশ, বাঁশখালী ও কর্ণফুলী উপজেলা থেকেও রোগীরা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে প্রতিদিনই রোগীর চাপ থাকে বেশি। ডেঙ্গুর মৌসুমে সেই চাপ আরও বেড়েছে।
আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠকর্মী ও প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জনগণের মধ্যে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি বলেন, আগস্ট মাসে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন এবং আটজনকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালের জনবল সংকটের বিষয়ে ডা. মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তিনটি টেকনোলজিস্ট পদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একজন কর্মরত। বাকি দুটি পদ শূন্য থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, ডেঙ্গু শনাক্তের সংখ্যা বাড়লেও মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ছে না। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মশার প্রজনন বাড়িয়ে দিতে পারে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মহিন উদ্দিন বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার সব সরকারি দপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কলেজ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, হাট-বাজার, আনোয়ারা মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং উপজেলার ১০০টি মসজিদে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতি শনিবার ধারাবাহিকভাবে সরকারি দপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হবে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল সংকট প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, শূন্য থাকা দুই টেকনোলজিস্ট পদে জনবল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। অতি শিগগিরই জনবল পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী। জনবল যুক্ত হলে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীর্ঘ লাইনও কমে আসবে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আনোয়ারায় রয়েছে সিইউএফএল, কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড), বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেড, কর্ণফুলী ড্রাই ডক লিমিটেড, পারকি সমুদ্রসৈকত ও দেশের প্রথম টানেল। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের আনাগোনা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মানুষের চাপ বাড়লেও জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় সেই অনুপাতে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এসএ




Comments