মুসলিম জাহানের এক অনন্য ও জ্যোতির্ময় নক্ষত্র, সুলতানুল আরেফিন, গাউসুল আজম বড় পীর মহিউদ্দিন হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)। ইসলামের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন মহান সংস্কারকই ছিলেন না, বরং তরিকতের জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক রাহবার বা দিশারী।
প্রতি বছর হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর ওফাত দিবস পালন করে, যা ‘পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে সুপরিচিত।
শাব্দিক ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
'ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম' শব্দটি মূলত ফারসি ও আরবি শব্দের একটি চমৎকার সংমিশ্রণ।
'ফাতেহা' (আরবি) শব্দের অর্থ— সূচনার সূচনা, উদ্বোধন বা কোনো মহান আত্মার উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-ইস্তিগফারের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানো (ঈসালে সওয়াব)।
'ইয়াজদাহম' (ফারসি) শব্দের অর্থ— এগারো বা একাদশ।
হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি ৯১ বছর বয়সে এই মহান অলী ইরাকের বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। রবিউস সানি মাসের এই এগারো তারিখের দিকে ইঙ্গিত করেই দিবসটিকে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলা হয়।
মুসলিম বিশ্বে এই দিবসের গুরুত্ব
মুসলিম সমাজে এই দিবসটি কোনো উৎসবের দিন নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করা এবং আউলিয়া কেরামের আদর্শকে জীবনে ধারণ করার দিন। মুসলমানরা এই দিনে বড় পীর সাহেবের জীবন, তাঁর কৃচ্ছ্রসাধন, আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম এবং ইসলামের প্রতি তাঁর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ-কিয়াম, পবিত্র কুরআন খতম এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে তাবাররুক বিতরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্রতার সঙ্গে উদযাপিত হয়।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও 'মহিউদ্দিন' উপাধি
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) ৪৭১ হিজরিতে পারস্যের (বর্তমান ইরান) জিলান নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশলতিকা পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হাসান (রা.) এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাধ্যমে সরাসরি নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র নসবনামার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
বাগদাদে যখন তিনি পা রাখেন, তখন খেলাফতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। মানুষ সুন্নাহর পথ ছেড়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হচ্ছিল। তিনি তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে মৃতপ্রায় সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এই কারণেই ইসলামের ইতিহাসে তাঁকে 'মহিউদ্দিন' বা 'দ্বীনের জীবনদানকারী' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
ইসলামের জন্য তাঁর মহান অবদান
বড় পীর সাহেব ছিলেন একাধারে যুগশ্রেষ্ঠ মুফতি, মুহাদ্দিস ও সুফিসাধক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কাদেরিয়া তরিকা’ আজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে কোটি কোটি মানুষের আত্মিক তৃষ্ণা নিবারণ করছে। তিনি বাগদাদের মাদরাসায় প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের পাঠ দিতেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সংকলন 'ফুতুহুল গাইব' এবং 'গুনিয়াতুত তালেবীন' আজো মানবজাতির জন্য হেদায়েতের অমূল্য গ্রন্থ। তাঁর সুমহান দাওয়াতে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং লক্ষাধিক পাপিষ্ঠ মানুষ তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসেন।
ঐতিহাসিক কারামত: শৈশবের সত্যবাদিতা
বড় পীর সাহেবের জীবন অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা বা কারামতে ভরপুর। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর শৈশবে, যা আধ্যাত্মিক শক্তির চেয়ে তাঁর নৈতিক চরিত্রের শক্তির এক মহীয়সী বহিঃপ্রকাশ।
উচ্চশিক্ষার জন্য বাগদাদ যাওয়ার সময় তাঁর মা তাঁর জামার আস্তিনের নিচে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা সেলাই করে দেন এবং অসিয়ত করেন, “বাবা, জীবন চলে গেলেও কখনো মিথ্যা বলো না।” পথিমধ্যে কাফেলাটি একদল দুর্ধর্ষ ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতরা সবার সবকিছু লুটে নেওয়ার পর ছোট্ট আব্দুল কাদেরকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কাছে কিছু আছে?” তিনি অকপটে বললেন, “হ্যাঁ, আমার জামার নিচে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে।” ডাকাত সর্দার প্রথমে বিশ্বাস করেনি, কিন্তু জামা কেটে মুদ্রাগুলো বের করার পর সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। সর্দার জিজ্ঞেস করল, “তুমি গোপন রাখলে তো আমরা জানতে পারতাম না, তবে কেন বললে?” বালক আব্দুল কাদের উত্তর দিলেন, “আমার মা আমাকে কখনো মিথ্যা না বলতে অসিয়ত করেছেন। সামান্য টাকার জন্য আমি মায়ের অসিয়ত এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে পারি না।”
এই নিষ্পাপ বালকের সত্যনিষ্ঠা ও খোদাভীতি ডাকাত সর্দারের অন্তরে প্রচণ্ড আঘাত করে। সে কেঁদে ফেলে এবং বড় পীর সাহেবের হাতে হাত রেখে দলবলসহ তওবা করে ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসে। এটি ছিল এমন এক আত্মিক কারামত, যা একদল দুর্ধর্ষ অপরাধীকে আল্লাহর অলীতে রূপান্তরিত করেছিল।
বড় পীর মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী সম্পর্কে মনীষীদের ভবিষ্যদ্বাণী
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর আগমনের পূর্বে এবং তাঁর সমসাময়িক যুগে অনেক বড় বড় আউলিয়া কেরাম তাঁর উচ্চ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
প্রখ্যাত সুফি হযরত আবু বকর বিন হা ওয়ারী (রহ.) বড় পীর সাহেবের জন্মের আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, “শীঘ্রই বাগদাদে একজন মহান অলীর আত্মপ্রকাশ ঘটবে, যাঁর মর্যাদা হবে আল্লাহর দরবারে অনন্য।”
স্বয়ং বড় পীর আল্লাহর বাতেনি নির্দেশে তাঁর বিখ্যাত কাসিদায় ঘোষণা করেছিলেন
“ক্বদামী হাজিহী আলা রাকাবাতি কুল্লি অলিয়্যিল্লাহ” (আমার এই পদযুগল প্রত্যেক আল্লাহর অলীর ঘাড়ের ওপর অবস্থিত)।
এই ঘোষণার পর সমসাময়িক যুগের সমস্ত মহান আউলিয়া কেরাম (যাঁদের মধ্যে সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ. অন্যতম) আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর এই শ্রেষ্ঠত্বকে বিনম্র চিত্তে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
আউলিয়ায়ে কেরামের মর্যাদা: কুরআন ও হাদিসের আলোকে
ইসলামে আউলিয়া কেরাম বা আল্লাহর বন্ধুদের সুমহান মর্যাদা অত্যন্ত সুউচ্চ। তারা আল্লাহর দ্বীনকে জমিনে টিকিয়ে রাখার প্রধান মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আউলিয়াদের প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
অনুবাদ: “জেনে রাখো! নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর বন্ধু (অলী), তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬২)
পবিত্র হাদিস শরীফেও (হাদিসে কুদসী) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আউলিয়া কেরামের অবমাননাকারীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। রাসূলে কারীম (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
অনুবাদ: “যে ব্যক্তি আমার কোনো অলীর (বন্ধুর) সঙ্গে শত্রুতা করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৬৫০২)
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম কেবল একটি তিথি বা আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; এটি বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ত্যাগ, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের এক জীবন্ত স্মারক। বর্তমানের অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে সুফিবাদের এই মূল চেতনা—অর্থাৎ শান্তিবাদ, সত্যবাদিতা এবং মানবসেবাকে বুকে ধারণ করাই হোক এই পবিত্র দিবসের মূল শিক্ষা।
ডিআর




Comments