Image description

ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণ ও ট্রেনের কোচে আগুনের পর দেশজুড়ে রেলস্টেশনগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অন্যতম প্রধান চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের নিরাপত্তায় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। 

প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে মূল প্রবেশপথ— সর্বত্রই ভবঘুরে ও টোকাইদের অবাধ বিচরণ। কিন্তু যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেই পুলিশ বা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যদের যেন চরম অভাব। যাত্রীদের স্টেশনে প্রবেশের ক্ষেত্রে নেই কোনো তল্লাশি, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি। 

পুরোনো স্টেশনের একাধিক অরক্ষিত গেট খোলা থাকলেও নজরদারির কোনো বালাই নেই। এমনকি স্টেশনের একমাত্র স্ক্যানার মেশিনটি আদৌ চালু আছে কি না, সেই তথ্যও জানা নেই খোদ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (পূর্বাঞ্চল) কমান্ডেন্টের!

গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে সরেজমিনে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা মেলে। স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো স্টেশনজুড়ে টোকাই ও ভবঘুরেদের অবাধ যাতায়াত। কেউ প্রকাশ্যে নেশা করছে, কেউ বা প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে আছে। পুরো প্ল্যাটফর্মে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) কিংবা আরএনবির কোনো সদস্যের দেখা পাওয়া যায়নি। এমনকি স্টেশনের মূল প্রবেশদ্বারেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ ছিলেন না।

পুরোনো স্টেশনের ভেতরের আরও তিনটি গেটেও কোনো নিরাপত্তাকর্মী দেখা যায়নি। এসব অরক্ষিত পথ দিয়ে ভবঘুরে, হকার ও সান্ধ্যকালীন অপরাধীরা অবাধে যাতায়াত করছে। অন্যদিকে নতুন স্টেশনের ভেতরে কেবল ছয়জন সদস্যকে বসে থাকতে দেখা গেছে, তাঁরা সবাই জেনারেল শাখার। পুরো স্টেশন চত্বরে অস্ত্রধারী কোনো পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মী চোখে পড়েনি।

নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম স্টেশনে জেনারেল শাখায় ৭৪ জন এবং অস্ত্র শাখায় ৮০ জন সদস্য রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি রোস্টারে অন্তত ১০ জনের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও বাস্তবে ডিউটিতে থাকেন মাত্র ৫ থেকে ৬ জন।

নতুন স্টেশনের প্রধান প্রবেশপথ ছাড়াও পুরোনো স্টেশনের পূর্ব দিকের একটি গেট সার্বক্ষণিক খোলা থাকে। এর সামান্য উত্তরে আরও একটি গেট উন্মুক্ত। সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাঝুঁকি কদমতলী অংশে, যেখানে স্টেশনের সীমানা ঘেঁষে অসংখ্য ভাসমান ভবঘুরে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে।

এই নিরাপত্তাহীনতায় শুধু সাধারণ যাত্রীরাই নন, আতঙ্কে রয়েছেন স্বয়ং নিরাপত্তা বাহিনীর নিম্নপদস্থ সদস্যরাও। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে খালি ট্রেনের র‍্যাক মেরামত ও ধোয়ামোছার জন্য যখন মার্শালিং ইয়ার্ডে নেওয়া হয়, তখন ট্র্যেকের সুরক্ষায় দায়িত্বে থাকেন মাত্র দুজন নিরস্ত্র সদস্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সদস্য জানান, খালি ট্রেন ইয়ার্ডে নেওয়ার পথে প্রায়ই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালায় দুষ্কৃতকারী ও টোকাইরা। দেশের বিভিন্ন স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার পর তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তাঁরা অবিলম্বে স্টেশনে অস্ত্রধারী সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

দুপুর দেড়টার দিকে দেখা যায়, স্টেশনে ভৈরব ও নাজিরহাটমুখী ট্রেনের খালি র‍্যাকসহ আরও দুটি ট্রেনের খালি র‍্যাক দাঁড়িয়ে আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য এগুলো শিগগিরই ইয়ার্ডে নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ১৬টি আন্তঃনগর, ৫টি লোকাল এবং ৭ জোড়া শাটল ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে দৈনিক কয়েক হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

স্টেশনে কথা হয় ভৈরবগামী যাত্রী আবু তৈয়বের সঙ্গে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘হঠাৎ করে কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও কোচে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমরা সাধারণ যাত্রীরা চরম আতঙ্কে আছি। কিন্তু এখানে এসে দেখছি নিরাপত্তার ন্যূনতম কোনো তৎপরতা নেই। ট্রেন ও যাত্রীদের জীবন রক্ষায় দ্রুত নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।’’

তবে স্টেশন এলাকায় সতর্কাবস্থা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর বলেন, ‘‘কমলাপুরের ঘটনার পর আমরা সতর্ক আছি। যাত্রীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে বিস্ফোরক ও শরীর তল্লাশির যন্ত্র না থাকায় এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।’’

সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে রেলওয়ে থানার (জিআরপি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন কুমার দে বলেন, ‘‘আমি কোর্টে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। তবে আমরা সতর্ক অবস্থায় আছি।’’

পুরো প্ল্যাটফর্মে একজন পুলিশ সদস্যকেও দেখা যায়নি— এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ‘‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি’’ বলেই দায় সাড়েন।

অন্যদিকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (পূর্বাঞ্চল) চিফ কমান্ডেন্ট মো. মোরশেদ আলম বলেন, ‘‘সব স্টেশনে বাড়তি নজরদারি ও টহল জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা ইন্সপেক্টরদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করছি।’’

তবে অরক্ষিত তিনটি প্রবেশপথ ও কদমতলী অংশের তীব্র ঝুঁকি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বরাবরের মতো জনবল সংকটের অজুহাত দেন। প্ল্যাটফর্মে কোনো সদস্য না থাকা এবং কার্যালয়ে বসে থাকার বিষয়ে তিনি খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে স্টেশনের প্রবেশদ্বারে থাকা স্ক্যানার মেশিনটি সচল আছে কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘সেটি আমার জানা নেই।’’

ডিআর