Image description

দায়িত্ব গ্রহণের আগেই পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান-২ অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন জুয়েলের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে ভোট গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। জয়নাল আবেদিনের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যান-২-এর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার সুযোগ নেই। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আইনে নির্ধারিত কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অযোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনাস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন জয়নাল আবেদিন। তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া অনাস্থা কার্যক্রম বাতিল করে ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আইনে নির্ধারিত কারণ নেই, তবুও অনাস্থা

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জয়নাল আবেদিন বলেন, সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব ভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ প্যানেল চেয়ারম্যান-২ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার আগেই তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা আইনসম্মত নয়।

তিনি দাবি করেন, শুধু জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পরবর্তী ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হওয়ার কারণে তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জয়নাল আবেদিন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ৩৯ ধারার (১) উপধারায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিধান রয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলন ও অনিয়মসহ আইনে উল্লেখিত কারণের ভিত্তিতে অনাস্থা আনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যেসব কারণ দেখানো হয়েছে, সেগুলো আইনে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের আওতায় পড়ে না।

তাঁর ভাষ্য, অনাস্থা প্রস্তাবের আবেদনে প্যানেল চেয়ারম্যান-২ হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধেও স্বাক্ষরকারীদের আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আইনজীবী—এ বিষয়টিকেও কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব কারণ কোনোভাবেই আইনে বর্ণিত অনাস্থার সুনির্দিষ্ট কারণ নয় বলে দাবি করেন তিনি।

হাইকোর্টে রিট, স্থগিতাদেশ নিয়ে জটিলতা

জয়নাল আবেদিন জানান, অনাস্থা প্রস্তাবের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। রিট নম্বর ১১৪৪২/২০২৬। তাঁর দাবি, আদালত অনাস্থা প্রস্তাব কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে অনাস্থা প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেওয়া শোকজ নোটিশসহ পরবর্তী কার্যক্রম চার মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া চার মাসের স্থগিতাদেশ স্থগিত করে রুল নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দেন।

তবে আপিল বিভাগের আদেশের জাবেদা কপি পাওয়ার আগেই বিশেষ সভা করে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জয়নাল আবেদিন আরও অভিযোগ করেন, আপিল বিভাগের আদেশ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কর্মকর্তা তাঁকে ভুল তথ্য দিয়ে জানিয়েছিলেন যে রিট মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

‘আইনের চেয়ে ওপরের নির্দেশকে গুরুত্ব’

পবা উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জয়নাল আবেদিন। তাঁর অভিযোগ, প্যানেল চেয়ারম্যান-২-এর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার আইনি সুযোগ না থাকলেও উপজেলা প্রশাসন তা গ্রহণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আইনগত বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ওপরের নির্দেশ’কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ভোটের ফলাফল ও সভার রেজুলেশন সরকারের কাছে পাঠানো হবে। সরকার অনাস্থা প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারে, আবার নাও করতে পারে। তবে আদালতে রুল নিষ্পত্তির আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আদালত অবমাননার শামিল হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অনাস্থা কার্যক্রম বাতিল না হলে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার পাশাপাশি আদালত অবমাননার বিষয়েও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এ বিষয়ে অনাস্থা প্রস্তাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পবা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান বলেন, ‘যিনি অভিযোগ করেছেন, তাকেই বলুন। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

এদিকে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনুল আবেদীন, রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সবুর আলী এবং জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কল রিসিভ না করায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্যানেল চেয়ারম্যান ঘিরে নতুন জটিলতা

হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম ও নতুন প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যেই প্যানেল চেয়ারম্যান-২ হিসেবে জয়নাল আবেদিন জুয়েলকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

অনাস্থা ভোট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আদালতের চলমান কার্যক্রম—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আইনি ও প্রশাসনিক দুই পর্যায়েই আলোচনায় এসেছে। রিটের রুলের নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এ জটিলতার পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।

এসএ