১ কোটি মানুষের মাদক নিয়ন্ত্রণে ১টি মাত্র গাড়ি ও ৩৬ জনবল, সংকটে গাজীপুর ডিএনসি
প্রায় এক কোটি মানুষের মাদক নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে মাত্র একটি গাড়ি ও ৩৬ জনবল নিয়ে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও যানবাহন সংকটে ধুঁকছে সংস্থাটির জেলা কার্যালয়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান, নজরদারি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কর্মকর্তাদের।
ডিএনসি সূত্রে জানা যায়, শিল্পাঞ্চল হওয়ায় গাজীপুরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। গাজীপুর মহানগরের আটটি থানা ও জেলার পাঁচটি উপজেলা মিলিয়ে মোট ১৩টি থানার প্রায় এক কোটি মানুষের মাদক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জেলা ডিএনসি। অথচ এ কার্যালয়ে অনুমোদিত জনবল মাত্র ৩৬ জন। এর মধ্যে ২৫ জন এনফোর্সমেন্ট সদস্য মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। যানবাহন রয়েছে মাত্র একটি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাদকবিরোধী অভিযানে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি গাড়ি দিয়ে ১৩টি থানার বিশাল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কখনো ভাড়া গাড়ি, আবার কখনো ইজিবাইক ব্যবহার করে অভিযানে যেতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণ হয়। এর সুযোগে মাদক কারবারিরা পালিয়ে যায়।
গাজীপুর ডিএনসির উপপরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম মিঠুন মানবকণ্ঠকে বলেন, “মাদক সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অনেক সময় গাড়ি সংকটে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। গাড়ি বা ইজিবাইক ভাড়া করে যেতে হয়। ভাড়া গাড়ি নিয়ে দূরের এলাকায় যেতে সময় বেশি লাগে। অনেক ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। আবার আসামি আটকের পর দূরের পথ হলে তাকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হয়।”
উপপরিচালক আরও বলেন, “জনবল সংকট থাকলেও মাদক অপরাধ দমনে গাজীপুর ডিএনসি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে যানবাহন সংকটে অনেক বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।”
ডিএনসি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজীপুরে ১ হাজার ১১৬টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ৩৬২ জনের বিরুদ্ধে ৩০৯টি নিয়মিত মামলা করা হয়। জব্দ করা হয় ২১ হাজার ৫৩২ পিস ইয়াবা, ২৩৮ দশমিক ৮৭১ কেজি গাঁজা, ৩৮৫ বোতল ফেনসিডিল, ৫ হাজার ১০০ অ্যাম্পুল ইনজেকশন, ৩১৫ লিটার চোলাই মদ, ৩ হাজার ৭০০ লিটার ওয়াশ/জাওয়া ও ৫৪২ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট। এছাড়া একটি প্রাইভেটকার, একটি সিএনজি ও নগদ ১২ লাখ টাকা জব্দ করা হয়।
২০২৫ সালে ১ হাজার ৩৫১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ৫২৩ জনকে আসামি করে ৫০২টি নিয়মিত মামলা করা হয়। এ সময় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৫ পিস ইয়াবা, ৩০৫ কেজি গাঁজা, ১৬৫ লিটার চোলাই মদ, ৩৪৪ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ৬০০ লিটার ওয়াশ, এক লিটার বিলাতি মদ ও একটি ট্রাক জব্দ করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯০১টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে গাজীপুর ডিএনসি। এসব অভিযানে ৪৬১টি মামলা হয়েছে এবং ৪৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ সময় ৪৫ হাজার ৪৫১ পিস ইয়াবা, ১৩৬ দশমিক ৪৭ কেজি গাঁজা, ২ হাজার ২৭৮ দশমিক ৬২ লিটার রেক্টিফাইড স্পিরিট, ৩ হাজার ৬৭৯ অ্যাম্পুল ইনজেকশন, ৮০ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১০১ ক্যান বিয়ার, তিন বোতল বিদেশি মদ, নয় পিস এমডিএমএ/এক্সটাসি, ১৩৫ গ্রাম টেট্রাহাইড্রোকেনাবিনল/কুশ, ৭৭ পিস এলএসডি, ১৬৫ গ্রাম ক্যানবিস চকলেট, ৫০ লিটার চোলাই মদ ও ১৭০ লিটার ওয়াশ জব্দ করা হয়। এছাড়া একটি পিকআপ, একটি মোটরসাইকেল, একটি সিএনজি ও নগদ ২ লাখ ২ হাজার ৫০ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
জনবল ও যানবাহন সংকটের পাশাপাশি নিজস্ব কার্যালয় নিয়েও সমস্যায় রয়েছে গাজীপুর ডিএনসি। মহানগরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্মশান মোড়ে ভাড়া ভবনে চলছে জেলা কার্যালয়ের কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আটক আসামি, জব্দ করা যানবাহন ও আলামত সংরক্ষণ, নিরাপত্তা এবং সদ্য অনুমোদিত অস্ত্রনীতিমালা অনুযায়ী অস্ত্রাগার নির্মাণের জন্য নিজস্ব কার্যালয় প্রয়োজন। এজন্য নিজস্ব অফিস ভবন স্থাপনের বিষয়টি জরুরি হয়ে পড়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। মাঠ পর্যায়ে নিরস্ত্র অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একাধিকবার সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হলে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। একই সঙ্গে গাজীপুর মহানগরের আটটি থানা ও পাঁচটি উপজেলায় পৃথক জনবল, গাড়ি ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নিশ্চিত করা হলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
ডিআর




Comments