গাইবান্ধার জমিদারবাড়ি: তুলসী লাহিড়ীর স্মৃতিবিজড়িত রাজপ্রাসাদ কালের গর্ভে বিলীন
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নে নীরবে-নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন নলডাঙ্গা জমিদারবাড়ি। ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলের খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই রাজপ্রাসাদ। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সরেজমিনে গেলে স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, শিবচন্দ্র ও শম্ভুচন্দ্র নামে দুই প্রভাবশালী ভাই প্রথম নলডাঙ্গা অঞ্চলে এসে জমিদার বংশ ও রাজপ্রাসাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে শিবচন্দ্রের বংশধর এবং বিখ্যাত নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর পিতা সুরেন্দ্রচন্দ্র লাহিড়ী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সময়ে প্রাসাদের সৌন্দর্য ও স্থাপত্যশৈলীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের কাশ্মীর থেকে উন্নতমানের ছোট নকশা করা ইট ও মূল্যবান পাথর এনে প্রাসাদের দেয়াল ও মন্দিরে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা হয়েছিল। এসব নান্দনিক নির্মাণকাজ সে সময়ের স্থাপত্যশৈলীতে এই জমিদারবাড়িকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল।
এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার তুলসী লাহিড়ীর স্মৃতি। ১৮৯৭ সালে এই ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদেই তাঁর জন্ম হয় বলে স্থানীয় ইতিহাসসূত্রে জানা যায়। বাংলা নাট্যসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা তাঁর রচিত ‘ছেঁড়া তার’ ও ‘পথিক’সহ বিভিন্ন নাটক আজও পাঠক ও দর্শকের কাছে সমাদৃত।
কালের বিবর্তন, অবহেলা ও দীর্ঘদিনের অযত্নে মূল রাজপ্রাসাদটি এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবে ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও জমিদারি আমলের কিছু স্থাপত্য ও স্মৃতিচিহ্ন এখনও টিকে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ তদারকি ও নিরাপত্তার অভাবে জমিদারবাড়ির অবশিষ্ট সম্পদও এখন হুমকির মুখে। অসচেতনতার সুযোগে ইতোমধ্যে দেয়ালের মূল্যবান ভাস্কর্য, কষ্টিপাথরের প্রাচীন মূর্তি, মূল ফটকের ঐতিহাসিক দরজা এবং তুলসী লাহিড়ীর ব্যবহৃত বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন চুরি হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের দাবি, দ্রুত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নলডাঙ্গা জমিদারবাড়ি সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিক। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত হবে বাংলা নাট্যজগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব তুলসী লাহিড়ীর স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থান।
এসএ




Comments