মিরসরাইয়ে আড়াই কোটি লিটার লুব্রিকেন্ট উৎপাদনের হাব তৈরি করছে র্যানকন
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে ও লুব্রিকেন্ট শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মিরসরাইয়ে এক মেগা প্রকল্প নিয়ে এসেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী র্যানকন লুব্রিকেন্টস লিমিটেড। আন্তর্জাতিক মানের লুব্রিকেন্ট উৎপাদন কারখানা স্থাপনে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা ধরে) বিনিয়োগ করবে।
৬ দশমিক ৫ একর জমিতে স্থাপিতব্য এ কারখানায় বছরে প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার লুব্রিকেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। প্রকল্পটিতে সরাসরি ২৫০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিপণন ও কারিগরি সেবায় পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, র্যানকন এতদিন যে লুব্রিকেন্ট আমদানি করে দেশের বাজারে সরবরাহ করত, এখন সেই ব্যবসার একটি বড় অংশ স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন কারখানায় বিদেশ থেকে মূল কাঁচামাল ‘বেস অয়েল’ সহ প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করে দেশেই লুব্রিকেন্ট মিশ্রণ ও প্রসেসিং করা হবে। ফলে আমদানিনির্ভর বাজারে স্থানীয় মূল্যসংযোজন ও নিজস্ব উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের মাইলফলক ও ৫০ বছরের চুক্তি
গত ৫ অক্টোবর বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ ও র্যানকন লুব্রিকেন্টস লিমিটেডের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষে সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রোচি এবং র্যানকন লুব্রিকেন্টসের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান জামান খান চুক্তিতে সই করেন। তিনটি সরকারি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পর এটিই নতুন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ভূমি ইজারা চুক্তি।
চুক্তি অনুযায়ী, জমি হস্তান্তরের তারিখ থেকে ৫০ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ইজারাদার মেয়াদ নবায়নের সুযোগ পাবেন। চুক্তি স্বাক্ষরের ৯০ দিনের মধ্যে র্যানকনকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। জমি বুঝে পাওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে কারখানা নির্মাণ শুরু এবং ৩৬ মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তি, পণ্য সম্ভার ও সরাসরি জাহাজ থেকে কাঁচামাল সুবিধা
র র্যানকন লুব্রিকেন্টসের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও ব্যবস্থাপক আল-আমিন তালুকদার জানান, কারখানাটিতে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা থাকবে। এসব সুবিধার মাধ্যমে উৎপাদিত লুব্রিকেন্টের গুণগত মান শতভাগ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত শিল্প ইউনিটে সড়কপথে কাঁচামাল গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সরাসরি সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বেস অয়েল গ্রহণের বিশেষ সমন্বিত সুবিধা রাখা হচ্ছে। কারখানায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্র্যান্ডের উচ্চমানের লুব্রিকেন্ট উৎপাদিত হবে। এখানে মোটরসাইকেল, অটোমোবাইল ও শিল্পকারখানায় ব্যবহারের লুব্রিকেন্টের পাশাপাশি গিয়ার অয়েল, তাপ পরিবাহী তেল, কম্প্রেসর অয়েল, ট্রান্সফরমার অয়েল এবং বিশেষ ধরনের গ্রিজ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দুই দশকের বিপণন অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব উৎপাদনে রূপান্তর
লুব্রিকেন্ট ব্যবসায় র্যানকনের অভিজ্ঞতা সুদীর্ঘ। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পগোষ্ঠী বর্তমানে মোটরগাড়ি, ইলেকট্রনিকস, আবাসন, মোটরসাইকেল, সামুদ্রিক খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, নিরাপত্তা সেবা ও লুব্রিকেন্টসহ বহুবিধ খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। র্যানকন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘র্যাংকস পেট্রোলিয়াম’ ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্বখ্যাত ‘শেল’ লুব্রিকেন্টের ম্যাক্রো ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ এ খাতে প্রতিষ্ঠানটির দুই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সম্প্রতি তারা ফরাসি ব্র্যান্ড ‘মোটুল’ এর বাজারজাতকরণও শুরু করেছে।
দীর্ঘদিনের আমদানি ও ডিস্ট্রিবিউশন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে র্যানকন এখন দেশীয় উৎপাদন অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থায় স্থানীয় মূল্যসংযোজনের বড় ক্ষেত্র তৈরি করবে। বর্তমানে দেশে লুব্রিকেন্টের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। তৈরি পণ্যের বদলে কাঁচামাল এনে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহের বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।
বহুমুখী কর্মসংস্থান ও জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লক্ষ্য
প্রকল্পটির মাধ্যমে কারখানার উৎপাদন, প্রকৌশল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসন, নিরাপত্তা, গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সরাসরি ২৫০ জনের বেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনবলের স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে। এর বাইরে কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য বিতরণ, প্যাকেজিং, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরবরাহকারী ও বিক্রয় নেটওয়ার্কে বিশাল পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
র্যানকনের এই বিনিয়োগের আরেকটি কৌশলগত দিক হলো এর অবস্থান। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনী এলাকার বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে, যার পরিকল্পিত মোট আয়তন প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৫ একর। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।
সড়ক, বন্দর ও রেল সংযোগকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বিশাল শিল্পাঞ্চলে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ লাখ কর্মসংস্থান এবং ১৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
শিল্প খাতে প্রভাব, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও পরিবেশগত সুশাসন
এই বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলে র্যানকনের মতো স্থানীয় বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগের ফলে পোশাক, ইস্পাত, খাদ্য ও কেমিক্যাল শিল্পের পাশাপাশি হাই-টেক লুব্রিকেন্ট খাতের উপস্থিতি শিল্প অবকাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করবে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পকারখানা, নির্মাণ ও পরিবহন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় উপজাত উপকরণের যোগান দেশের ভেতর থেকেই নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি বলেন, র্যানকনের মতো প্রতিষ্ঠিত বিনিয়োগকারীর এই প্রতিশ্রুতি নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার বড় প্রমাণ এবং এটি অন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দেবে।
প্রকল্পটিতে শুধু উৎপাদন ও ব্যবসার বিষয় নয়, পরিবেশগত সুশাসনকেও চুক্তির শর্তে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। র্যানকনকে নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ও পয়ঃনিষ্কাশন প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শোধন ব্যবস্থার (সিইটিপি) সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশসম্মত সবুজ শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশের আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় কারিগরি সক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
এসএ




Comments