শরীয়তপুরের জাজিরায় নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বিলীন; শেষ সম্বল হারিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা মানুষ।
নার্গিস আক্তারের একসময় ছিল মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার। নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে চলছিল তাঁর সংসার। কিন্তু ১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিকান্দি এলাকায় তাঁদের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন পদ্মার উত্তর তীরের আলম খানকান্দি গ্রামে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে সেখানে আবারও গড়ে তোলেন বসতবাড়ি। চাষাবাদ শুরু করেন ১০ বিঘা জমিতে।
কিন্তু এক যুগ পর সেই পদ্মাই আবার কেড়ে নিল তাঁর শেষ সম্বল। বসতভিটার সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ১০ বিঘা ফসলি জমিও। দ্বিতীয়বারের মতো ঘরবাড়ি ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে নার্গিস। কোথায় গিয়ে ঠাঁই হবে, কীভাবে চলবে সংসার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর জানা নেই তাঁর।
সোমবার পদ্মার তীরে বসে বিষণ্ন মনে চোখের জল ফেলছিলেন নার্গিস। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার আছিল। ১২ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারাইয়া আবার ঘুইরা দাঁড়াইছিলাম। জমিতে চাষাবাদ কইরা পরিবার নিয়ে সুখে দিন কাটতেছিল। এহন তাও গেল। বসতবাড়ি আর ফসলি জমি হারাইয়া অজানার উদ্দেশ্যে ছুটতাছি। জানি না ভাগ্যে কী আছে।’
নার্গিসের এই অসহায়ত্ব কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া চরের আলম খানকান্দি এলাকায় পদ্মার ভাঙনে গত দুই মাসে বসতভিটা হারিয়েছে ৩০৩টি পরিবার। কারও ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে, কেউ ভাঙনের আশঙ্কায় আগেভাগেই ঘর খুলে সরিয়ে নিচ্ছেন। যাঁরা সর্বস্ব হারিয়েছেন, তাঁদের কেউ আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তার ওপর, কেউ ফসলি জমিতে। আবার কেউ পরিবার নিয়ে ছুটছেন পদ্মার দক্ষিণ তীরের জাজিরা কিংবা উত্তর তীরের মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় একটু নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।
একসময় যে চর ছিল মানুষের বসতি, কৃষিকাজ ও জীবিকার ঠিকানা, সেখানে এখন প্রতিনিয়ত ভর করছে অনিশ্চয়তা। নদীর ভাঙনে শুধু মাটির সীমানাই মুছে যাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বহু বছরের শ্রম, স্মৃতি, স্বপ্ন আর ফিরে দাঁড়ানোর শেষ অবলম্বন।
এক বছরে বিলীন হাজার হাজার একর জমি
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর উত্তর তীরে প্রায় ৩০ বছর আগে পাইনপাড়া মৌজায় একটি চর জেগে ওঠে। পরে সেখানে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। ওই চরের ছয়টি গ্রাম নিয়ে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত। এলাকাটিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস।
গত বছর পদ্মার ভাঙনে ২ নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ মাঝিকান্দি, মঙ্গল মাঝিকান্দি, আলীম উদ্দিন ব্যাপারীকান্দি ও মাঝিকান্দি গ্রাম বিলীন হয়ে যায়। তখন গৃহহীন হন প্রায় দেড় হাজার পরিবার। নদীগর্ভে বিলীন হয় ৫২ নম্বর পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেজিয়া আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে আগস্ট থেকে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলম খানকান্দি এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়। গত দুই মাসে সেখানে ৩০৩টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। পাইনপাড়া মৌজায় এক বছরে অন্তত পাঁচ হাজার একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে ১২২ নম্বর আলতাফ খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও।
ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যস্ত হচ্ছে চরবাসীর যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা। ২০২১ সালে চরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পদ্মার তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় ছয়টি গ্রামে। প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করে ১ হাজার ২০০ গ্রাহককে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নদীভাঙনে সঞ্চালন লাইনের প্রায় ২২ কিলোমিটার এবং পাকা সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার বিলীন হয়ে গেছে।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে গড়ে তোলা এসব অবকাঠামো এখন নদীর গ্রাসে। যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চরবাসীর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
ঘর সরানোর ব্যস্ততা, চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
চারদিকে পদ্মা নদীঘেরা পাইনপাড়া চরে নৌপথ ছাড়া যাতায়াতের অন্য কোনো মাধ্যম নেই। শনিবার আলম খানকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ টিন, কাঠ ও ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসতভিটা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছেন।
যাঁদের বাড়ি ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে কিংবা ফসলি জমিতে। মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই, সামনে জীবিকার নিশ্চয়তাও নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় যাবেন, কীভাবে নতুন করে সংসার গড়বেন—এমন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।
চরের মানুষের কাছে ঘরবাড়ি হারানো মানে শুধু একটি স্থাপনা হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় চাষের জমি, আয়ের উৎস, সামাজিক পরিচিতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবনযাপনের ভিত্তি।
পাঁচ বিঘা জমিই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন
নাসির কাজি ও তাঁর স্ত্রী সুফিয়া ২০ বছর আগে আলম খানকান্দি গ্রামে বসতি গড়েছিলেন। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করে চলত তাঁদের সংসার। দুই ছেলে নিজেদের ভাগের জমি নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর জীবনের প্রধান অবলম্বন ছিল ওই জমিটুকু।
কিন্তু গত সপ্তাহে পদ্মা তাঁদের বসতবাড়ি ও ফসলি জমিও কেড়ে নিয়েছে। এখন পাশের একটি ফসলি জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা।
সুফিয়া বলেন, ‘দুই ছেলে তাদের ভাগের জমি নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ কইরাই আমরা দুইজন চলতেছিলাম। পদ্মা নদী বসতবাড়ির সঙ্গে সেই জমিটুকুও কেড়ে নিছে। এখন কোথায় যাব, কী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করব—এই চিন্তায় ঘুম আসে না।’
বয়সের এই সময়ে নতুন করে জীবন শুরু করার মতো শক্তি কিংবা সামর্থ্য কতটুকু আছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই দম্পতি। যে জমিতে চাষাবাদ করে বাকি জীবনটা কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই জমিই এখন নদীর তলদেশে।
চারবার ভাঙনের শিকার কুদ্দুস
কুদ্দুস ব্যাপারী গত ৩০ বছরে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবারই নতুন করে বসতি গড়েছেন, চেষ্টা করেছেন জীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর। কিন্তু এবার নদী তাঁর বাড়ির এত কাছে চলে এসেছে যে সোমবার তাঁকে বসতঘর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায়। বারবার ঠিকানা বদলাতে বদলাতে ক্লান্ত কুদ্দুসের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অসহায়ত্ব।
তিনি বলেন, ‘জানি না কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। থাকার মতো আর কোনো ঠিকানা রইল না। এখন থেকে উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম। কাগজে-কলমে হয়তো গ্রামের নাম থাকবে, কিন্তু আমাদের পা ফেলার কোনো জায়গা থাকবে না।’
কুদ্দুসের কথায় ফুটে ওঠে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা। নদী তাঁদের ঘর কেড়ে নেয়, জমি কেড়ে নেয়; কিন্তু নতুন করে কোথায় বসতি গড়বেন, কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের নিজেদেরই খুঁজতে হয়।
অভিযোগের পরও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেই
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকলেও চরটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান বলেন, ‘পদ্মা সেতুর পূর্ব দিকে পাইনপাড়া চরটি অবস্থিত। গত তিন-চার বছর ধরে চরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন দুই থেকে তিন হাজার মানুষ ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে।’
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ২৭৩টি পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ। তবে তাৎক্ষণিক খাদ্যসহায়তা পেলেও বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং জীবিকার ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন বলেন, ‘আলম খানকান্দি এলাকায় ভাঙন রয়েছে, তা আমরা জানি। ওই এলাকায় ভাঙনে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। চর এলাকায় নদীভাঙন রোধে বা প্রতিরক্ষার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জরুরি কোনো কাজ বাস্তবায়ন করছে না।’
নদী শুধু জমি নেয় না, কেড়ে নেয় মানুষের ভবিষ্যৎও
পাইনপাড়া চরের মানুষের জীবনে পদ্মা একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার নাম। নদীর পলি জমে যে চর জেগে উঠেছিল, সেখানে মানুষ স্বপ্ন বুনেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন ঘরবাড়ি, চাষাবাদের জমি, সড়ক ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা। কিন্তু নদীভাঙনে সেই অর্জন একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
নার্গিস, সুফিয়া কিংবা কুদ্দুস—তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু অসহায়ত্বের জায়গাটি একই। কেউ দ্বিতীয়বার, কেউ চতুর্থবারের মতো ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন ঠিকানার সন্ধানে। তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরবর্তী বর্ষায় কোথায় দাঁড়াবেন তাঁরা?
একটি গ্রামের অস্তিত্ব মানচিত্রে কিংবা সরকারি নথিতে থেকে যেতে পারে। কিন্তু সেই গ্রামের মানুষ যদি ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকার সব অবলম্বন হারিয়ে ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন এলাকায়, তবে সেই অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবন ও স্মৃতিগুলো কোথায় ঠাঁই পাবে?
পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে নার্গিসের চোখের জল যেন সেই প্রশ্নই তুলে ধরে। নদীভাঙন থামাতে কার্যকর উদ্যোগ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ আশ্রয় এবং জীবিকা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা না হলে পাইনপাড়া চরের মানুষের কাছে প্রতিটি বর্ষাই হয়ে থাকবে নতুন করে উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা। তাঁদের প্রয়োজন শুধু সাময়িক ত্রাণ নয়; প্রয়োজন নিরাপদ বসতি, টেকসই পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার অধিকার।
এসএ




Comments