জোয়ার-ভাটার পানিতেই জীবন
ভাঙা বাঁধে ঝুলে আছে মোংলার মানুষের ভাগ্য
ঘরের নিচে হাঁটুপানি লোনা জল। ভাঙা রাস্তার দুই পাশে থইথই করছে জোয়ারের পানি। খুঁটির ওপর কোনোরকমে দাঁড়িয়ে থাকা গোলপাতার ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন এক নারী। তাঁর চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাপ। পাশে বাঁধা ছোট্ট নৌকাটিই চলাচলের একমাত্র ভরসা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দৃশ্য নয়; বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনিরগোল ও বানিয়াশান্তা এলাকার মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
এলাকার চারটি গ্রামের মানুষের জীবন এখন জোয়ার-ভাটার পানির সঙ্গে লড়াই করেই কাটছে। জোয়ারের পানি ও ভাঙনের কারণে চলাচলের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পানি ঢুকে পড়ছে বসতঘরের নিচে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, সীমিত হয়ে পড়ছে মানুষের চলাচল। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা নেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা দেশের অর্থনীতি ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই উপকূলকে ঘিরে রয়েছে মৎস্যসম্পদ, কৃষি, নৌবাণিজ্য ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। অথচ একই উপকূলের বহু মানুষকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভাঙন, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও নিরাপদ পানির সংকট। মোংলার জয়মনিরগোল-বানিয়াশান্তা এলাকার পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি চিত্র।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপকূলের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা ও নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। তাঁদের দাবি, ভাঙা বাঁধ ও রাস্তা মেরামত, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদে ঝুঁকি বাড়ছে। জোয়ারের পানি, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ত পানি কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং নিরাপদ খাবার পানির সংকট আরও তীব্র করছে। এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
জয়মনিরগোলা সাইলো-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগম দৈনিক মানবকণ্ঠকে বলেন, “জোয়ার আইলে ঘর থেইক্যা বাইর হওন যায় না। রাস্তা ভাইঙা গেছে, পোলাপান স্কুলে যাইতে পারে না। আমরা বড় অসহায়।”
রাবেয়া বেগমের এই বক্তব্য শুধু একজন মানুষের অসহায়ত্বের প্রকাশ নয়; বরং উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে বসবাসকারী বহু পরিবারের দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। যেখানে নিরাপদে ঘর থেকে বের হওয়া, শিশুদের স্কুলে পাঠানো কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় ঝুঁকি এখন বৈশ্বিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর অভিযোজনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা, তাঁদের প্রয়োজন এবং প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জয়মনিরগোল-বানিয়াশান্তার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজন টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উঁচু ও টেকসই সড়ক তৈরি, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী উৎস নিশ্চিত করা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু জরুরি সহায়তা নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ।
বাংলাদেশের উপকূলকে সম্ভাবনার অঞ্চলে পরিণত করতে হলে এখানকার মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনমানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জয়মনিরগোল-বানিয়াশান্তার বাসিন্দাদের কাছে এখন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির চেয়ে জরুরি ভাঙা বাঁধের স্থায়ী সমাধান, চলাচলের উপযোগী রাস্তা এবং নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা।
এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে জোয়ার-ভাটার পানির সঙ্গে লড়াই করেই দিন কাটাতে হবে উপকূলের হাজারো মানুষকে। তাই এখন সময় শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার নয়, বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের।
এসএ




Comments