নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল ও সাবেক উপাচার্যকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে টানা ৩৪ দিন ধরে চরম অচলাবস্থায় স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটি শেষ হলেও গত রোববার হাতে গোনা কয়েকটি বিভাগ ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে ফেরেননি। আন্দোলন গড়ালেও শুরুতে হাজারো শিক্ষার্থীর সমর্থন থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৪০ জনে। ক্লাস-পরীক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মারাত্মক সেশনজটের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের অভিযোগ—একটি বিশেষ মহল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে পণ করে চুয়েটকে অচল রাখার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
আন্দোলনের সূত্রপাত যেভাবে
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের এক দফা দাবিতে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম থমকে যায় এবং ৭টি বিভাগের অন্তত ৩৪টি সেমিস্টার পরীক্ষা বাতিল করতে হয় প্রশাসনকে।
নিয়োগ পাওয়ার ২১ দিন পর, গত ১২ অক্টোবর সকাল ৯টায় চুয়েট ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। খবর পেয়ে সাড়ে ৯টা থেকে ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে ওইদিন দুপুর ১২টার পর তাঁরা প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এতে নতুন ভিসিসহ ১১ জন কর্মকর্তা টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টা ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ থাকেন। পরবর্তীতে তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে পরবর্তীতে ক্যাম্পাসের বাইরে নগরীর সার্কিট হাউসে চুয়েটের সিন্ডিকেট সভা ডাকতে বাধ্য হন ভিসি।
ক্লাসে ফেরার ঘোষণা, ফের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
টানা শাটডাউনে ক্যাম্পাসে ক্ষোভ দানা বাঁধলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চুয়েট শিক্ষার্থীদের নামে একটি বেনামী ও মোবাইল নম্বরবিহীন খোলা চিঠি ছড়ানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘ অচলাবস্থায় সেশনজট ও শিক্ষাজীবনের অপূরণীয় ক্ষতি বিবেচনা করে আজ ২৮ অক্টোবর থেকে ক্লাস ও পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের এ আবেদনে শিক্ষকেরাও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
তবে খোলা চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়, ক্লাসে ফেরা মানেই নবনিযুক্ত উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলমের নেতৃত্বকে মেনে নেওয়া বা আন্দোলন প্রত্যাহার নয়। সাবেক ভিসি ড. সায়েমকে না ফেরানো পর্যন্ত এক দফা আন্দোলন চলবে। নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করলে কিংবা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন শুরু করলে তাৎক্ষণিকভাবে আবারও ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হবে।
বহিরাগত ইন্ধন, গোপন জুম বৈঠকে ছক
শুরুতে আন্দোলন মুখর থাকলেও দিন দিন সাধারণ শিক্ষার্থীরা সরে যাচ্ছেন। চুয়েটের শিক্ষার্থীরা জানান, বর্তমানে রাজপথে ৩০-৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নেই। লোকবল সংকট ঢাকতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিরাগতদের এনে আন্দোলন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে চুয়েটের আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সমর্থিত শিক্ষকদের একটি গোপন অনলাইন জুম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ওই জুম বৈঠকেই চুয়েটকে দীর্ঘমেয়াদে অচল রাখার ছক তৈরি করা হয়।
শিক্ষকদের দ্বিমত ও সমিতির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
আন্দোলনবিরোধী শিক্ষকেরা মনে করছেন, উপাচার্য নিয়োগ সম্পূর্ণ সরকারের প্রশাসনিক এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। সরকারি প্রজ্ঞাপনের সুবিধা ভোগ করে পরবর্তীতে সেই সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া পেশাগত আচরণের পরিপন্থী।
এদিকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শেখ আরাফাত রহমানকে অবাঞ্ছিত করার ঘটনায় চুয়েট শিক্ষক সমিতির ওপর চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সাধারণ শিক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিবাদের দোসর অভিযোগে কোনো শিক্ষককে সমিতি অবাঞ্ছিত করেনি। অথচ কোরামহীন সভা ডেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতিকে জোরপূর্বক যৌথ বিবৃতিতে সই করিয়ে এক শিক্ষককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। মাত্র ২-৩ জন শিক্ষক নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে কুক্ষিগত করে রেখেছেন বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
এদিকে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থায় শিক্ষাজীবন মারাত্মক সেশনজট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। গত রবিবার ক্যাম্পাস খুললেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছুটি শেষে এখনও ফেরেননি। শুরুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন থাকলেও পরবর্তীতে সেখান থেকে সরে এসেছেন বেশিরভাগই।
শিক্ষার্থীরা জানান, অনেকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে তাঁদের আন্দোলনে নামাতেন। সেই ভীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই অনেকে বাড়িতে চলে গেছেন। কখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলেই কেবল তাঁরা ফিরে আসবেন।
ডিআর




Comments