Image description

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা অংশে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনজীবীদের অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন জেলে-বাওয়ালিরা। বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হলে জলদস্যুদের বিভিন্ন দলের কাছ থেকে অগ্রিম ‘কার্ড’ বা টোকেন নিতে হচ্ছে। এ জন্য প্রতিটি দলকে দিতে হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। কোনো দলের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা না হলে অপহরণ করে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।

বনজীবীদের দাবি, শর্তসাপেক্ষে ৫২ জন জলদস্যুর আত্মসমর্পণের পরও দস্যুতা বন্ধ হয়নি। বর্তমানে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ৮ থেকে ১০টি জলদস্যু দল সক্রিয় রয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এসব দলের কাছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে বলে দাবি করছেন তাঁরা।

বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের আগে জলদস্যুদের বিভিন্ন দলের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার চাপ বেড়েছে। ১৫ দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একাধিক দলের কাছ থেকে কথিত কার্ড সংগ্রহ করতে হচ্ছে। শ্যামনগর উপকূলের প্রায় ২০ হাজার জেলে-বাওয়ালি এ পরিস্থিতির শিকার বলে দাবি তাঁদের।

সমঝোতা না করলে জেলেদের অপহরণ ও নির্যাতনের পাশাপাশি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে অনেক বনজীবী জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের তথ্যের বরাত দিয়ে বনজীবীরা জানান, আগে রাজস্ব দিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি নিত। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পারমিট নিয়েছে মাত্র ১৫০টি নৌকা। এতে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকা সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে।

বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি বাহিনীগুলোর তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভয়ারণ্যে প্রবেশকারী জেলেদের শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হলেও বন বিভাগের কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকেও বনজীবীদের অপহরণের ঘটনা ঘটছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

শুধু মানুষের জীবিকাই নয়, জলদস্যুদের তৎপরতা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বনজীবীরা। তাঁদের মতে, নিজেদের চলাচল নিরাপদ রাখা এবং অপরাধ আড়াল করতে দস্যুরা বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে জলদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের জেলেরা পাঁচ দিনের ধারাবাহিক প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির সমন্বয় করছেন গাবুরার তরুণ নেতা ও সাতক্ষীরা জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন লিটন।

কর্মসূচির চতুর্থ দিনে আগামীকাল ১ নভেম্বর শ্যামনগর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া ৩ নভেম্বর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বনজীবীদের দাবি, সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। প্রায় ৬ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ বন উপকূলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে বন ও পরিবেশমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

তাঁদের প্রত্যাশা, জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে আর কোনো জেলেকে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হতে হবে না।

এসএ