রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ঐতিহাসিক প্যারিস রোডে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি সম্বলিত একটি বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কিত এই বিলবোর্ডটি দ্রুত সরিয়ে ফেলার দাবিতে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, এটি কোনো যুদ্ধাপরাধীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা নয়, বরং তৎকালীন বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে আনাই তাদের মূল লক্ষ্য।
রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে বিলবোর্ডটি স্থাপন করা হয়। এতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
বিলবোর্ডটি স্থাপনের পরপরই এর প্রতিবাদে সরব হয় ছাত্রসংগঠনগুলো। অবস্থান কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, "যুদ্ধাপরাধীদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ বা পুনর্বাসনের চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধীদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না।"
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, "৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি প্রদর্শন অত্যন্ত আপত্তিকর। নোভোকালচারের প্রতিষ্ঠাতা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের বিষয় রয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।"
তবে এই বিলবোর্ডের সঙ্গে রাকসুর কোনো সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন রাকসু সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি বলেন, "এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এতে রাকসুর কোনো অর্থায়ন বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেই।"
বিলবোর্ডটির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ‘নোভোকালচার’-এর পরিচালক ও রাকসুর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার তার বক্তব্যে বলেন, "বিলবোর্ডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বা রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচারব্যবস্থার প্রশ্নটি তোলা। বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন, আয়নাঘর এবং শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিচারব্যবস্থা যে বিতর্কিত ছিল, সেটিই এখানে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।"
তিনি আরও দাবি করেন, এর মাধ্যমে কাউকে অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক শুরু করাই তাদের উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, "প্যারিস রোডে বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবি ব্যবহার করা হবে—এমনটি আমাদের জানানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।"
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments