Image description

ইলিশ মাছ বাঙালির কাছে কেবল একটি খাদ্যবস্তু নয়, বরং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালির হেঁশেলে ইলিশের কদর সম্বন্ধে নতুন কিছু বলার নেই। ইলিশ মাছের সঙ্গে আমাদের লোকগাথা ও জীবনযাত্রার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেক সাহিত্যিক ইলিশের রূপ, স্বাদ এবং জেলেদের জীবনযাত্রা নিয়ে গদ্য-পদ্য লিখেছেন। পদ্মা, মেঘনা বা রূপসা নদীর ইলিশ নিয়ে প্রচলিত লোকগানগুলোতে উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রামের ছাপ ফুটে উঠেছে।

বাঙালির নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইলিশ মাছ আমাদের সংস্কৃতির সেই রুপালি সুতা, যা আজও আমাদের শিকড়ের সঙ্গে আটকে রাখে। মত্স্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ খুব সংবেদনশীল চরিত্রের মাছ। এর জন্ম সাগরে, কিন্তু ডিম ছাড়ার জন্য তাকে সাগর ছেড়ে মিঠাপানিতে আসতে হয়।

আমাদের দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো মিঠে পানিতে ভরা। তাই ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে। এর মধ্য থেকে আবার সেই ছোট বা জাটকা ইলিশ চলে যায় সাগরে। ইলিশ স্বভাবগতভাবে পরিযায়ী মাছ। সমুদ্র থেকে নদী আর নদী থেকে সমুদ্র অবিরাম তার চলাচল। মাছ হিসেবে ইলিশের পছন্দ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। যে কারণে জন্ম ও বেড়ে ওঠার জন্য দূষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভালো পরিবেশ না পেলে ইলিশ বিমুখ হয়ে ভিন্ন পথে চলে যায়।

চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরের সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ চ্যানেলে রুপালি ইলিশ বেড়েছে। গতবারের তুলনায় এবার মৌসুমের শুরু থেকে বেশি মাছ ধরা পড়ায় সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন জেলেরা।

অন্যদিকে সাগর উপকূলে ঝাঁকা ঝাঁকা ইলিশ দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্রেতারা। তবে দাম বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ ক্রেতাই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, ১২ জুন সাগরে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর থেকে জেলেরা প্রতিদিন সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ চ্যানেলে জাল ফেলছেন। প্রতিদিনই অল্প ইলিশ ধরা পড়লেও অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে।

সীতাকুণ্ডের কুমিরা-সন্দ্বীপ ঘাটঘর, বাঁশবাড়িয়া ও সলিমপুর সাগর উপকূল ঘুরে দেখা গেছে, জেলেরা সাগর থেকে ইলিশ শিকার করে ফিরছেন। তাদের প্রত্যেকের ঝুড়িতেই কমবেশি ইলিশ আছে। আর ঝাঁকা কাঁধে জেলেদের সাগর উপকূলে ফিরতে দেখলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ইলিশের পাইকারি ব্যবসায়ী, সাধারণ ক্রেতাসহ মাছ কেনাবেচায় থাকা দালালরা। তবে ইলিশ ধরা পড়লেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছেন জেলেরা।

উপজেলার কুমিরা ঘাটঘর এলাকার বাসিন্দা জেলে বিপ্লব জলদাশ বলেন, ‘জুলাই মাসে ইলিশ একটু বেশি ধরা পড়ছে। কিন্তু তা এমন নয় যে অনেক বেশি। যেখানে গত দুই-তিন বছর একদমই পাওয়া যাচ্ছিল না , সে তুলনায় এখন কিছুটা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যা মাছ পাচ্ছি তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ কারণে ইলিশ নিয়ে উপকূলে আসার সঙ্গে সঙ্গে টানাটানি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতা ১০ জন হলে কিনতে পারছেন দু-একজন, তা-ও দাম বেশি।’ 

তিনি জানান, তারা ঘাটে পাইকারি দরে ইলিশ বিক্রি করেন। ঝাঁকাতে যা ইলিশ রাখা হয় তা ক্রেতারা দেখে সাইজ হিসেবে দাম করেন। এক ঝাঁকায় ৮-১০ কেজি থাকলে তা সাইজ অনুসারে কখনো চার-পাঁচ হাজার টাকা, কখনো ছয়-সাত হাজার টাকায় বিক্রি হয়। পাইকাররা এ রকম অনেক ঝাঁকা থেকে মাছ কিনে বড়, মাঝারি ও ছোট মাছগুলোকে আলাদা করে বেশি দামে বিক্রি করেন। তারা এক কেজি সাইজের মাছগুলো এক হাজার ৫শ থেকে এক হাজার ৮শ এবং ৭শ থেকে ৮শ গ্রাম ওজনের মাছগুলো এক হাজার ২শ থেকে এক হাজার ৩শ টাকায় প্রতি কেজি বিক্রি করেন। তবে মাছ আগের চেয়ে বেশি পড়ায় তাদের আয়ও বেড়েছে। 

ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জেলে সর্দার বাদল জলদাস বলেন, ‘গত তিন মৌসুম খুব খারাপ কেটেছে। এবার সে তুলনায় মাছ বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতেই বোঝা যায়, বছরটা কেমন যাবে। তা থেকে আমরা আশা করছি এবার কিছুটা লাভের মুখ দেখবেন জেলেরা।’ জেলেরা খুশি হলেও সাগর উপকূলে মাছ কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতারা মোটেও খুশি নন। কুমিরা সাগর উপকূলে মাছ কিনতে আসা শহীদ, হৃদয় দাশ, মো. আসলামসহ আরো কয়েকজন হতাশার সঙ্গে বলেন, তারা কেউই মাছ কিনতে পারেননি শুধুমাত্র অতিরিক্ত দামের কারণে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, এবার গত বছরের চেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। গত বছরের জুন মাসে সীতাকুণ্ডে ইলিশ ধরা পড়েছিল ১০ মেট্রিক টন। এবার ওই সময় ১২ টন পাওয়া গেছে।