Image description

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার অর্থনীতি, নৌ-যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান অবলম্বন তেতুলিয়া নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট এবং ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহন নৌ-রুট।

 তবে নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় নাব্যতা সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে যাত্রী, ব্যবসায়ী, জেলে ও ট্রলার মালিকরা নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকদের দাবি, নদীর তলদেশে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো ও ট্রলার নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অনেক সময় ডুবোচরে ধাক্কা লেগে নৌযান ও পণ্যের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

নাজিরপুর এলাকার লালমোহনগামী ট্রলারচালকদের অভিযোগ, নাব্যতা সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমেও তাদের প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয়, সময় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

ঢাকা-কালাইয়া নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্যতা কমে যাওয়ায় লঞ্চ চলাচলে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীরা বেশি দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন।

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করে নৌপথের নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা গেলে কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট, চন্দ্রদ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুটে স্বাভাবিক নৌ-যোগাযোগ পুনঃস্থাপন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বজায় থাকলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও ঘরবাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে ভিটি বালুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বালু সরবরাহ না থাকায় অনেক উন্নয়নকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাই পরিবেশগত ও আইনগত বিধান মেনে বালুমহাল ইজারা কার্যক্রম চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে, সম্প্রতি গণমাধ্যমে তেতুলিয়া নদীতে ড্রেজিং ও নদীভাঙন নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও জেলে। তাদের দাবি, সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীভাঙনকবলিত এলাকায় গত দুই বছর, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোনো ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি।

স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, গত ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী দীর্ঘ সময়ে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের মতো বর্তমান সময়ের বালু উত্তোলনকে নদীভাঙনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলেও তারা দাবি করেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে দ্রুত পরিকল্পিত ড্রেজিং, পরিবেশসম্মত বালুমহাল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তাদের মতে, এতে নৌ-পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ এবং উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, “তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কালাইয়া হাট এবং যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে এবং সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক, জেলে ও সাধারণ মানুষের দাবি, পরিবেশগত ও আইনগত বিধান মেনে দ্রুত নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পাবে।