Image description

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে একটি চালকল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্স গ্রহণ এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকা মিলের নামেও সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় চালের বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার অর্ধশতাধিক চালকল মালিকের বিরুদ্ধে এই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার নিবন্ধিত ১৪২টি চালকলের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টির অস্তিত্ব বা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই সরকারি চাল সরবরাহের বরাদ্দ পাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর ধরে অচল ও অস্তিত্বহীন মিলের নামে এভাবেই কোটি কোটি টাকার চালের কোটা বাগিয়ে নিচ্ছেন প্রভাবশালী মালিকরা।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অভিযুক্ত চালকলগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কোথাও মিলঘর তালাবদ্ধ, আবার কোথাও আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে চাতাল। কয়েকটি মিলে বয়লার, ড্রায়ার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এমনকি কোনো কোনো চালকলের জায়গায় অন্য ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই। স্থানীয়দের দাবি, এসব মিলে দীর্ঘ দিন ধরে ধান ভাঙানো বা চাল উৎপাদনের কোনো কার্যক্রম নেই। এরপরও সরকারি তালিকায় এগুলোকে ‘সচল’ দেখিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

তদন্তে জানা যায়, উপজেলা চালকল মালিক সমিতির পরিচালক এস. এম. সাগর সরকারের নামে ‘মেসার্স আনোয়ারা সেমি অটো চালকল’ ও ‘মেসার্স সারা চালকল’ নামে দুটি লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে একটি মিল প্রায় ১২ বছর ধরে পরিত্যক্ত। অথচ চলতি ২০২৬ সালের সিদ্ধ চাল সংগ্রহ কর্মসূচিতে এই প্রতিষ্ঠান দুটির নামে ১৬৪ মেট্রিক টনের বেশি চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে ‘মেসার্স মামা-ভাগ্নে সেমি অটো চালকল’-এর মালিক আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে একটি চালকল দেখিয়ে নিজের ও স্বজনদের নামে তিনটি লাইসেন্সের মাধ্যমে ২০৯ মেট্রিক টনের বেশি চালের বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ‘মেসার্স সামি সেমি অটো চালকল’ ও ‘মেসার্স খাজা সেমি অটো চালকল’-এর মধ্যে একটি সচল থাকলেও অন্যটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরপরও দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৯১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত ‘মেসার্স আকন্দ সেমি অটো চালকল’-এর নামেও রয়েছে ৬২ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ।

চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওমর ও ওমেলা সেমি অটো চালকলের অস্তিত্ব থাকলেও ‘লুৎফর সেমি অটো চালকল’ নামে কোনো মিলের অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে ওই চাতালে আগাছা জন্মেছে এবং বয়লারের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। অভিযোগ রয়েছে, একই চাতাল দেখিয়ে বাবা-ছেলের নামে চারটি লাইসেন্স ব্যবহার করে চলতি মৌসুমে ১৪৭ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা এস. এম. সোহাগ সরকার অভিযোগ করেন, আনোয়ারা, বিশাল, সারা, কোহিনূর, সমন্বয়, পিতা-পুত্র, মামা-ভাগ্নে, সোহাগ-৩, সোনালী, খাজা, হাজী কাউসার, নুসরাত, সরকার, রাফি, লুৎফর ও ওমরসহ অর্ধশতাধিক চালকলের বিরুদ্ধে একই চাতাল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্সের মাধ্যমে বরাদ্দ নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া অনেক মিলের পরিবেশগত ছাড়পত্র ২০১৩ সালের পর আর নবায়ন করা হয়নি।

এ বিষয়ে মেসার্স হাজী কায়সার সেমি অটো চালকলের মালিক মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, "এক সময় ডিসি ফুড থেকে আমাদের লাইসেন্স করতে বলা হয়েছিল, তাই আবেদন করে দুটি লাইসেন্স নিয়েছি। সত্য কথা বলতে, নিয়ম অনুযায়ী আমার লাইসেন্স বাতিল হওয়ার কথা থাকলে হবে।" উপজেলা চালকল মালিক সমিতির পরিচালক এস. এম. সাগর সরকার বলেন, "শ্রমিক সংকটের কারণে একটি মিল বন্ধ ছিল, যা আবার চালু করা হবে।"

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, নিবন্ধিত তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, "আমাদের একটি মনিটরিং টিম তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে।"

পরিবেশ অধিদপ্তর, সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. তুহিন আলম জানান, অধিকাংশ রাইস মিলের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। দ্রুতই এসব মিলকে নোটিশ দিয়ে অভিযান চালানো হবে।

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, "একই চাতাল বা অস্তিত্বহীন মিলের নামে বরাদ্দ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

মানবকণ্ঠ/ডিআর