শেকড়ের টান সঙ্গে নিয়েই উচ্চশিক্ষার পথে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা
পাহাড়ের সবুজ, শৈশবের পরিচিত পরিবেশ আর নিজের ভাষায় কথা বলার স্বস্তি—সবকিছু পেছনে ফেলে উচ্চশিক্ষার জন্য সমতলের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পড়াশোনার চাপ সামলানো কিংবা যাতায়াতের নানা সমস্যার সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের সামনে থাকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখা।
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কাছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এ দিনটি নিজেদের পরিচয়, অধিকার ও সংস্কৃতির কথা বলার সুযোগ। নিজেদের শেকড়ের গল্প অন্যদের সামনে তুলে ধরারও দিন।
৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being’। আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো এবং জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের প্রতিপাদ্যে।
দিবসটি উপলক্ষে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় ‘বৈচিত্র্যের সম্প্রীতি: আলোচনা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তারা তুলে ধরেন নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিক।
উচ্চশিক্ষার পথে নানা বাধা
দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক শিক্ষার্থী রাজধানীর কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসেন। তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, যাতায়াত ব্যয় এবং নতুন পরিবেশে বসবাস—সবকিছু মিলিয়ে তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুটা অন্য অনেক শিক্ষার্থীর তুলনায় কঠিন হয়ে ওঠে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানের আলোচনায়ও উঠে আসে এসব বাস্তবতার কথা। বক্তারা বলেন, আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নিজেদের সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াছিন আল মৃদুল দেওয়ান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই তারা এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় আরও অনেক কিছু করার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে এবং পড়াশোনায় আরও উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই প্রত্যাশা।
পাহাড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথের বাস্তবতা তুলে ধরেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শাহ আলম।
তিনি বলেন, পাহাড় থেকে যেসব শিক্ষার্থী গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন, তাদের অনেক কষ্ট করে আসতে হয়। যাতায়াতসহ নানা সমস্যা অতিক্রম করেই তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে আরও বেশি আদিবাসী শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন বিভাগে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিভা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই সুযোগ শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দেয় না, এর সঙ্গে বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের পেশাজীবন গড়ে তোলেন, তখন তার পথ ধরে আরও অনেক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
পরিচয় হারিয়ে নয়, পরিচয় নিয়েই এগিয়ে যাওয়া
উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আদিবাসী শিক্ষার্থীরা।
গণ বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (জিবিআইএসএ) সভাপতি অভিজিৎ চাকমা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দেশের বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সবার সামনে তুলে ধরাই তাদের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যেন সব জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগের জায়গা হয়ে ওঠে, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, স্মৃতি, জীবনযাপন ও পরিচয়। একইভাবে গান, নৃত্য, পোশাক কিংবা উৎসবের মধ্যেও বহন করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্য। তাই শিক্ষার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এসব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
সংস্কৃতির রঙে উদযাপন
আলোচনা সভার পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নিজেদের জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য, ভাষা ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ পরিবেশন করেন।
তাদের পরিবেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। পরিচিত ক্যাম্পাসের মধ্যেই উঠে আসে পাহাড় ও প্রত্যন্ত জনপদের সংস্কৃতির নানা রং। গান ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের শেকড়ের কাছে ফিরে যান, একই সঙ্গে অন্যদেরও সেই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তোলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কনক চন্দ্র রায়, ছাত্র উপদেষ্টা ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শাহ আলম, গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ইয়াছিন আল মৃদুল দেওয়ানসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই সম্প্রীতি
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের সৌন্দর্য শুধু তার ভূপ্রকৃতি কিংবা জনসংখ্যার বৈচিত্র্যে নয়; সেই বৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের সম্মান ও সহাবস্থানের মধ্যেও নিহিত।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনেও উঠে এসেছে সেই বার্তা। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা যেমন উচ্চশিক্ষার সুযোগ চান, তেমনি চান নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে।
তাদের এই পথচলায় প্রয়োজন সমান সুযোগ, সহনশীল পরিবেশ এবং পারস্পরিক সম্মান। কারণ বৈচিত্র্যকে মুছে দিয়ে নয়, বরং বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের দিনে তাই গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে যেন একই প্রত্যাশা—শিক্ষার পথে তারা এগিয়ে যাবেন, আর সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে হারিয়ে যাবে না তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও শেকড়।
এসএ




Comments