বর্ষার ভেজা বিকেল, টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আর কাদা মাখা গ্রাম্য মেঠো পথ। এই আবহে পটুয়াখালীর বাউফলের বাজারগুলোতে এখন দেখা মিলছে লালচে-বাদামি মখমলি খোসায় ঢাকা এক পরিচিত ফলের—বিলাতি গাব। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই ফলের মৌসুমে বাউফলের আকাশ-বাতাসে যেন ভেসে বেড়ায় শৈশবের সেই আবেগময় ঘ্রাণ।
উপজেলার কালাইয়া, নওমালা, কনকদিয়া, ধুলিয়া, আদাবাড়িয়া, দাসপাড়া এবং তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা চরাঞ্চলের অসংখ্য বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও উঁচু জমিতে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো বিলাতি গাবগাছ। প্রতিদিন ভোরে কৃষকেরা গাছ থেকে পাকা ফল পেড়ে ঝুড়ি বা প্লাস্টিকের ক্রেটে ভরে নিয়ে আসছেন স্থানীয় বাজারগুলোতে। কালাইয়ার সোমবারের হাট, বগার রোববারের বাজারসহ বাউফল ও নওমালা বাজারের আড়তগুলো এখন বিলাতি গাবের ঘ্রাণে ম-ম করছে।
এই ফলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের শৈশবের অমলিন স্মৃতি। একসময় বর্ষার ছুটিতে গ্রামীণ শিশু-কিশোরেরা দল বেঁধে গাবগাছের নিচে ভিড় করত গাছ থেকে পাকা ফল পড়ার অপেক্ষায়। বগা ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন খান (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় বর্ষা মানেই ছিল বিলাতি গাব পাকা। তখন কেউ এই ফল বিক্রি করত না, বন্ধুরা মিলে ভাগাভাগি করে খেতাম। এখন বাজারে অনেক গাব দেখি, কিন্তু সেই দিনের আনন্দ আর পাই না।”
বর্তমানে বিলাতি গাব গ্রামীণ বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। কালাইয়া বন্দরের আড়তদার মো. মিলন জানান, মৌসুমের শুরুতে প্রতি কুড়ি (২০টি) গাব ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ২০ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বড় ও উন্নত মানের ফলের চাহিদা বেশি থাকায় এসব গাব আড়ত থেকে রাজধানী ঢাকার পাইকারি বাজারেও পাঠানো হচ্ছে।
দাসপাড়া ইউনিয়নের কৃষক মো. আখতার ফারুক মুন্সি বলেন, “আগে এই ফলের তেমন কদর ছিল না, অনেক ফল গাছের নিচেই পচে নষ্ট হতো। কিন্তু এখন বাজারে চাহিদা থাকায় আমরা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছি।”
বিলাতি গাবের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে পুষ্টিবিদ ডা. আহসান উল ইসলাম বলেন, “এই প্রজন্মের অনেকের মধ্যে গাব খাওয়ার অনীহা থাকলেও এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, খাদ্যআঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন জানান, বাউফলের মাটি ও আবহাওয়া বিলাতি গাব চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে এসব গাছ বেড়ে উঠলেও পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক চাষের আওতায় আনা গেলে বিলাতি গাব এই অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হয়ে উঠতে পারে।
ডিআর




Comments