বৃষ্টিভেজা কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকের ভিড়, বদলাচ্ছে ‘অফ সিজন’ ধারণা
টানা বৃষ্টি, কালো মেঘ আর উত্তাল সমুদ্র—কক্সবাজারে এখন বর্ষার পূর্ণ আবহ। বৈরী আবহাওয়া ও সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল থাকার মধ্যেও থেমে নেই পর্যটকদের আনাগোনা। সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল থেকেই কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে দেখা গেছে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ বৃষ্টিতে ভিজে সৈকতে হাঁটছেন, আবার কেউ উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন উপভোগের পাশাপাশি ছবি তুলছেন। তবে ঝুঁকি উপেক্ষা করে অনেককেই সাগরে নামতে দেখা গেছে।
সমুদ্র উত্তাল থাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। লাল পতাকা সমুদ্রে গোসলের জন্য বিপৎসংকেত হলেও তা উপেক্ষা করে অনেক পর্যটক পানিতে নামছেন। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
সি-সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র লাইফগার্ড ও সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, "সমুদ্র এখন খুবই উত্তাল। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। এরপরও অনেকে পানিতে নামছেন। লাইফগার্ডরা তাদের সতর্ক করে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।"
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল রয়েছে এবং উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ কারণে সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি রয়েছে।
একসময় বর্ষাকাল ছিল কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য ‘অফ সিজন’। হোটেল-মোটেলের কক্ষ খালি থাকত, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কমে যেত মানুষের উপস্থিতি। সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বৃষ্টিস্নাত সৈকত, মেঘলা আকাশ ও উত্তাল ঢেউ উপভোগ করতে বর্ষাতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। সরকারি ছুটি না থাকলেও প্রতিদিনই কমবেশি পর্যটকের উপস্থিতি থাকছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে তৈরি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের ভ্রমণ-অভ্যাস পরিবর্তন, কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ, হোটেল-রিসোর্টের আকর্ষণীয় ছাড় এবং যোগাযোগব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়নের কারণে বর্ষার পর্যটন এখন আর আগের মতো মন্দা নয়।
কক্সবাজারে পর্যটক বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রেল যোগাযোগকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আসা-যাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ ও আরামদায়ক হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আন্তনগর ট্রেনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটেও ট্রেন চলাচল করছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, "ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল করছে। যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।"
বর্ষার পর্যটনকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে চলছে নানা ধরনের ছাড়। কোথাও কোথাও কক্ষ ভাড়ায় ৫০ শতাংশের বেশি ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে ভালো মানের আবাসন পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন পর্যটকরা।
স্যান্ডি বিচ রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্টের এমডি আবদুর রহমান বলেন, "বর্ষার শুরুতে তাদের রিসোর্টে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় রয়েছে। বৃষ্টিভেজা কক্সবাজারের ভিন্ন রূপ দেখতে পর্যটকরা আসছেন এবং অনেক সময় কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে যাচ্ছে।"
যশোর থেকে আসা পর্যটক সাদিয়া রহমান বলেন, "বৃষ্টি হলেও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে খুব ভালো লাগছে। ঢেউগুলো অনেক বড়। তবে লাল পতাকা দেখে আমরা পানিতে নামছি না, দূর থেকেই সমুদ্র দেখছি।" সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা রাকিব হাসান জানান, বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ আর বড় ঢেউ—সব মিলিয়ে বর্ষায় কক্সবাজারের পরিবেশ অন্যরকম। হোটেল ভাড়াও তুলনামূলক কম হওয়ায় ছুটির সুযোগে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, "পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও বিনিয়োগের তুলনায় তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। দেশীয় পর্যটক বাড়লেও বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে। পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য কার্যকর প্রচারণা প্রয়োজন।"
তবে বর্ষায় কক্সবাজারের সৈকত যতটা আকর্ষণীয়, উত্তাল সাগর ততটাই বিপজ্জনক। বিশেষ করে নিম্নচাপ, লঘুচাপ ও অতিবৃষ্টির সময়ে সাগরের ঢেউ ও স্রোত অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। সি-সেইফ লাইফগার্ডের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, "বর্ষায় সমুদ্র ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। লাল পতাকা টাঙানো থাকলে কোনোভাবেই পানিতে নামা উচিত নয়। পর্যটকদের অবশ্যই লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত নিরাপদ এলাকায় অবস্থান করতে হবে।"
সব মিলিয়ে কক্সবাজারের পর্যটনচিত্রে এবার নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট—বর্ষা এখন আর ‘অফ সিজন’ নয়। রেল, সড়ক ও বিমান যোগাযোগের সুবিধা, হোটেল-রিসোর্টের ছাড় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ষার কক্সবাজারের প্রচারের ফলে বছরজুড়েই পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ছে। বৃষ্টিভেজা সৈকত, মেঘলা আকাশ, উত্তাল ঢেউ আর মেরিন ড্রাইভের পাহাড়-সাগরের মিতালী—সব মিলিয়ে বর্ষায় কক্সবাজার যেন পেয়েছে এক নতুন পর্যটন পরিচয়।
ডিআর




Comments