গাজীপুর মেলা বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন, জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি
গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মেলা আয়োজন বন্ধ করে মাঠটি খেলাধুলা ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচি শেষে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন নেতৃবৃন্দ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন রাজবাড়ী সড়কে ‘সচেতন নাগরিক ঐক্য’র উদ্যোগে এ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অতীতে কখনো গাজীপুরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ী মাঠের পুরোটা দখল করে দীর্ঘমেয়াদি কোনো মেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষমেলা কিংবা সরকার নির্দেশিত কোনো মেলার আয়োজন হলেও তা মাঠের পশ্চিমাংশে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হতো। ফলে মাঠের বড় অংশ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকত।
তারা বলেন, রাজবাড়ী মাঠ শুধু একটি খেলার মাঠ নয়; এটি গাজীপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। গাজীপুরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মারা গেলে এই মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠের পুরোটা মেলার অবকাঠামো দিয়ে দখল করে রাখা হলে জরুরি ও সামাজিক প্রয়োজনে মাঠ ব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হবে।
বক্তারা আরও বলেন, রাজবাড়ী মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বাড়িতে বসবাস করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনের অংশও অতীতে সবসময় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মেলা বা সরকারি আয়োজন হলেও ঐতিহাসিক স্থানটির গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে স্থায়ী কোনো স্থাপনা দিয়ে জায়গা দখল করা হয়নি।
মানববন্ধনে বক্তারা মেলার নামে হাউজি, জুয়া ও লটারি বন্ধের দাবি জানান। তারা বলেন, উন্নয়ন মেলা, বৃক্ষমেলা কিংবা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক আয়োজন হতে পারে, তবে তার নামে জুয়া বা এমন কোনো আয়োজন গ্রহণযোগ্য নয়, যা সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মেলার কারণে জনদুর্ভোগ, যানজট, পরিবেশদূষণ এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন বক্তারা।
মানববন্ধনে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আহমদ আলী রুশদির সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান, গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ড. শহিদুজ্জামান, জয়নাল আবেদীন, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়নের সভাপতি প্রকৌশলী শামসুল হক, পেশাজীবী পরিষদ গাজীপুর জেলার সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, জয়দেবপুর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি রায়হান আল মাহমুদ রানা, গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মাহফুজুর রহমান খান, ছাত্রশক্তির সংগঠক মো. নাবিল, পেশাজীবী নেতা তোফাজ্জল হোসেন, এনসিপি নেতা আলী আকবর এবং বাজার ব্যবসায়ী কমিটির মো. বাবুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
বক্তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রথ মেলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও হাসপাতালের প্রধান সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রোগী, স্বজন ও সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে মেলার স্থান, পরিসর ও সময়সীমা নির্ধারণে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’-এর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মেলা আয়োজন বন্ধ করে মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী হিসেবে সংরক্ষণ এবং শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক কাজে মাঠ ব্যবহার করা হলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ ব্যাহত, মাঠের মাটি ও ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত, বর্জ্য ও পরিবেশদূষণ সৃষ্টি এবং অতিরিক্ত যানবাহন ও জনসমাগমের কারণে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া রাজবাড়ী মাঠের চারপাশে গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ, কাজী আজিম উদ্দিন কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। মেলার কারণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়।
স্মারকলিপি গ্রহণ করে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও দাবিগুলো মনোযোগ সহকারে শোনেন। তিনি রাজবাড়ী মাঠের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক গুরুত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, গাজীপুরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিক্ষা, খেলাধুলা ও জনস্বার্থের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত প্রশাসন নেবে না। মাঠের ব্যবহার নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জনস্বার্থ ও বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘গাজীপুরের মানুষের কল্যাণ ও স্বার্থই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ, শিক্ষার পরিবেশ এবং শহরের সামগ্রিক পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
এসএ




Comments