সংস্কারে বন্ধ চক্ষু বিভাগের স্বাভাবিক সেবা, ভোগান্তিতে রোগী
১৫ রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায়; বাইরে চিকিৎসায় বাড়ছে বাড়তি খরচ
চোখের চিকিৎসা নিতে এসে সরকারি হাসপাতালেই আটকে যাচ্ছে চিকিৎসার পথ। অপারেশন থিয়েটার সংস্কারের অজুহাতে প্রায় চার মাস ধরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে সাধারণ রোগীর ভর্তি কার্যক্রম সীমিত। ফলে চোখের জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসা অনেক রোগী ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। আর যাদের অস্ত্রোপচার জরুরি, তাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনির্দিষ্ট সময়। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ ছুটছেন বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে। এতে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ হারানোর পাশাপাশি গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চক্ষু বিভাগে সংস্কারকাজ চলার কারণে নিয়মিত রোগী ভর্তি সীমিত রাখা হয়েছে। তবে জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার চালু রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্ধারিত ওয়ার্ডের একটি বড় অংশ অন্য রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে চক্ষু রোগীদের জন্য কার্যত সীমিত পরিসরে চলছে চিকিৎসাসেবা। এর সঙ্গে অপারেশন থিয়েটার সংস্কারের কারণে নিয়মিত অস্ত্রোপচারও ব্যাহত হচ্ছে।
গত সোমবার রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের পৃথক দুটি ওয়ার্ডে মোট ১৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। পুরুষ ওয়ার্ডে ১০ জন এবং নারী ওয়ার্ডে পাঁচজন। ভর্তি রোগীদের অধিকাংশই পুরোনো রোগী এবং অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজন দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকলেও কবে অস্ত্রোপচার হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সূচি পাননি।
হাসপাতালের অন্য ওয়ার্ডগুলোতে যেখানে রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক-নার্সদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে চক্ষু বিভাগের অধিকাংশ বেডই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যেও প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন—এমন রোগীদের অনেকেই বাইরে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
১৫ দিন ধরে ভর্তি, নেই অপারেশনের সিরিয়াল
অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা এক রোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রায় ১৫ দিন আগে চোখের অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি হতে তাঁকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কিন্তু এখনও অস্ত্রোপচারের সিরিয়াল পাননি। কর্তব্যরত চিকিৎসককে বিষয়টি জানালে অপারেশন থিয়েটার সংস্কারের কারণে নিয়মিত অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।
এক নারী রোগী জানান, চোখের প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় ২০ দিন আগে শেষ হয়েছে। এরপরও অস্ত্রোপচারের তারিখ জানানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ‘অপারেশন তো হচ্ছেই না, ঠিকমতো কেউ দেখাশোনাও করতে আসে না।’
একাধিক রোগী জানান, অস্ত্রোপচারের আশায় দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। অপেক্ষার অনিশ্চয়তা কাটাতে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ওয়ার্ডের বড় অংশ অন্য রোগীদের জন্য
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চক্ষু বিভাগের নির্ধারিত ওয়ার্ডের দুটি অংশ ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে চক্ষু রোগীদের জন্য বর্তমানে মাত্র কয়েকটি কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি চক্ষু বিভাগের অপারেশন থিয়েটারও সংস্কার করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় দুই মাস ধরে অপারেশন থিয়েটারের সংস্কারকাজ চলছে। বর্তমানে একটি ছোট অপারেশন থিয়েটারে সীমিতসংখ্যক অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। ফলে নিয়মিত অস্ত্রোপচারের চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিভাগটিতে চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয় মিলিয়ে জনবল রয়েছে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ জন। এর মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানসহ চিকিৎসক ১১ জন, ইন্টার্ন চিকিৎসক প্রায় ১০ জন এবং নার্স রয়েছেন প্রায় ১২ জন। বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা মাত্র ১৫।
ব্যক্তিগত চেম্বারে বাড়ছে রোগীর চাপ
রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচার সীমিত থাকায় চক্ষু বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসককে ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি সময় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পেয়ে অনেককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একাংশ বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থ খরচ করে বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগীর চাপ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে বাইরে রোগী দেখার অভিযোগের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সপ্তাহে ২০-২৫ জনের অস্ত্রোপচার!
রামেক হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আমিনুর রশীদ আকন্দ বলেন, চক্ষু বিভাগে রোগী ভর্তির বিষয়টি তিনি পুরোপুরি জানেন না। সংস্কারকাজ চলার কারণেও ভর্তি সীমিত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা মিনি অপারেশন থিয়েটারে প্রতি সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ জন রোগীর অস্ত্রোপচার করি।’
বর্তমানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে চক্ষু বিভাগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৫ জন—এ তথ্য জানিয়ে তাঁদের কীভাবে সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫ জনের অস্ত্রোপচার হচ্ছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তবে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।
‘ইচ্ছা করে ভর্তি বন্ধ রাখা হয়নি’
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ইচ্ছা করে চক্ষু বিভাগে রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়নি। করোনা মহামারির সময় প্রয়োজনের তাগিদে রোগী ভর্তি বন্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
চিকিৎসকদের নির্ধারিত কর্মসময় নিয়ে বাইরে প্র্যাকটিস করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। কোনো চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে বাইরে প্রাইভেট সেক্টরে প্র্যাকটিস করলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিকল্প ব্যবস্থা কোথায়?
চক্ষু বিভাগে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে রোগী ভর্তি না হলেও রোগীদের জন্য কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের চিকিৎসায় দীর্ঘ অপেক্ষা রোগীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন রোগী ও স্বজনরা।
হাসপাতালের অন্য ওয়ার্ডগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও চক্ষু বিভাগের বড় অংশ ফাঁকা পড়ে থাকা, দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি থাকা রোগীদের অস্ত্রোপচার অনিশ্চিত হওয়া এবং নতুন রোগী ভর্তি সীমিত রাখার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে রোগীদের মধ্যে।
রোগীদের দাবি, সংস্কারকাজ প্রয়োজন হলে তা দ্রুত শেষ করে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা হোক। আর যতদিন পর্যন্ত স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব না হচ্ছে, ততদিন বিকল্প ব্যবস্থায় নিয়মিত অস্ত্রোপচার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যেন রোগীদের শেষ পর্যন্ত বাড়তি অর্থ খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে না হয়—এটাই এখন তাদের প্রত্যাশা।
এসএ




Comments