Image description

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সমতল করে সড়ক নির্মাণ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সায়মন বিচ পয়েন্ট পর্যন্ত দৃশ্যমান বালিয়াড়ি সরিয়ে নির্মাণকাজ চলার বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপর প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ আট ধরনের তথ্য চেয়ে প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সৈকতের সংবেদনশীল এলাকায় নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সুগন্ধা পয়েন্ট সংলগ্ন সৈকতে খননযন্ত্র দিয়ে বালু সমতল করে সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম চলছে। বালিয়াড়ি উপকূলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এর স্বাভাবিক গঠন ও ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তন করা হলে উপকূলীয় ক্ষয়, বালু সঞ্চালন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

এ অবস্থায় নির্মাণাধীন সড়কের প্রয়োজনীয়তা, অবস্থান, নকশা এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন ও বালু সঞ্চালনের ওপর প্রভাবের মূল্যায়ন, উপকূলীয় ক্ষয় ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রভাব, সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অনুমোদনসহ আট ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জমির মালিকানা-সংক্রান্ত খতিয়ান, দাগ, মৌজা ম্যাপ ও অন্যান্য ভূমি রেকর্ডও জমা দিতে বলা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠি গত শনিবার (২২ আগস্ট) প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) জেনারেল ম্যানেজার মো. আরিফুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকতের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়, যেখানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম আইনত নিষিদ্ধ।

৬৩ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্প
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের আওতায় সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সায়মন বিচ পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত এই সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পাওয়া ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৭ জুন চুক্তি হয় এবং ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। পৌরসভার দাবি, শহরের যানজট নিরসনে এই সড়ক জরুরি। তবে পরিবেশবাদীদের প্রশ্ন, পরিবেশগত ঝুঁকি ও বিকল্প নকশা বিবেচনা না করে কেন সৈকতের সংবেদনশীল এলাকায় এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

বেলার আইনি নোটিশ
সৈকতের ইসিএ ও নো ডেভেলপমেন্ট জোনে সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়ে রোববার (২৩ আগস্ট) সংশ্লিষ্ট ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ডাকযোগে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বেলার আইনজীবী জাকারিয়া সুলতানা। নোটিশপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক। নোটিশে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণ প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন।

বালিয়াড়ি রক্ষায় পরিবেশবাদীদের আহ্বান
পরিবেশবাদীরা বলছেন, সৈকতের বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়; এটি উপকূলের একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়। বালিয়াড়িতে থাকা সাগরলতা ও অন্যান্য উদ্ভিদ বালু ধরে রাখতে এবং জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে সহায়তা করে। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান মুহিবুল হক বলেন, প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে উন্নয়ন করা আত্মঘাতী। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশনা ও পরিবেশগত বিধিবিধান মেনেই এখানে কাজ করতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠি ও বেলার আইনি নোটিশের পর এখন দেখার বিষয়—প্রকল্পের কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয় কি না এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনি বৈধতা নিশ্চিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।

ডিআর