আমনের ভরা মৌসুমেও সার নিয়ে হাহাকার
বদলি রাজশাহীর উপপরিচালক
আমনের ভরা মৌসুমে জমিতে সার দেওয়ার ব্যস্ততা থাকার কথা কৃষকদের। অথচ প্রয়োজনীয় সার পেতে এক ডিলারের দোকান থেকে আরেক ডিলারের দোকানে ছুটতে হচ্ছে তাঁদের। কোথাও বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ, কোথাও আবার প্রয়োজন অনুযায়ী সার মিলছে না। দিনের পর দিন ঘুরেও সার না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন অনেক কৃষক। এর মধ্যেই সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগের পরিস্থিতিতে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার আলীমগঞ্জে বিসিআইসির সার ডিলার আবদুল গাফফারের ‘মেসার্স মুনলাইট কৃষি বিতান’ বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দোকানটি বন্ধ দেখা যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে কয়েকজন কৃষককে ফিরে যেতে দেখা যায়।
অপেক্ষমাণ কৃষকেরা ডিলার আবদুল গাফফারকে ফোন করলে তিনি রাজশাহীর বাইরে থাকার কথা জানান এবং ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বাজারে থাকার কথা জানান।
গোদাগাড়ী উপজেলার নতুন সাড়োইল গ্রামের কৃষক আব্দুর রউফ বলেন, এক বস্তা ইউরিয়া সার নেওয়ার জন্য তিন দিন ধরে ঘুরছেন তিনি। প্রতিবারই দোকান বন্ধ পেয়েছেন। রোববারও সার না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
পবার দামকুড়া থানার আলীমগঞ্জ গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, রোববার সকালে ওই বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সার নেওয়ার জন্য বেশ কয়েকজন কৃষক অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দোকান বন্ধ থাকায় কেউ সার কিনতে পারেননি। ডিলারকে ফোন করলে তিনি বাইরে থাকার কথা জানান এবং ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ব্যবস্থাপকও বাজারে থাকার কথা জানান।
বেলাল হোসেন বলেন, “সেখানে ১০ থেকে ১২ জন কৃষক সার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জমিতে তখনও সার দিতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে অন্য ডিলারের কাছে যেতে হয়েছে।”
বেলা ১টার দিকে ডিলার আবদুল গাফফার জানান, তাঁর ব্যবস্থাপক দোকান খুলেছেন। তবে ততক্ষণে অপেক্ষমাণ কৃষকেরা অন্যত্র চলে গেছেন। পরে বেলাল হোসেন জানান, পাঁচজন কৃষক মিলে অন্য ডিলারের কাছ থেকে সাত বস্তা ইউরিয়া সার কিনতে পেরেছেন।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি
এর আগে ‘ডিলারের কাছে সার নেই, খুচরা বাজারে চড়া দাম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। শুক্রবার গঠিত কমিটির প্রধান করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. খালেদুর রহমানকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার ও তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ।
জানা গেছে, কমিটি শনিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এদিকে তদন্ত চলার মধ্যেই শনিবার রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শরীয়তপুরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন।
বক্তব্য মেলেনি কৃষি কর্মকর্তাদের
বদলি ও সারসংকটের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রথমে মিটিংয়ে থাকার কথা জানান। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল কেটে দেন। দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
কার্যালয়ের কর্মচারীরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে তিনি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় গেছেন। বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে
রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। ওই ব্যবসায়ী বিভিন্ন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সার সংগ্রহ করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট ডিলারদের ইতোমধ্যে জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সার সংকট এড়াতে রাজশাহীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।”
এদিকে আমনের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো ইউরিয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে আমনের ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষকদের দাবি, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম দ্রুত বন্ধ করে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা রাখা এবং নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এসএ




Comments