রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি, দুই মাসে দ্বিগুণ এডিস
ব্রেটো সূচক ৬১.৩৩, রামেকে চিকিৎসাধীন ৩৪ ডেঙ্গু রোগী
রাজশাহীতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। নগরীর পাঁচ এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বের ব্রেটো সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩। মাত্র দুই মাস আগে মে মাসে একই সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্রেটো সূচক ২০-এর বেশি হলে কোনো এলাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিবেচিত হয়। সে হিসাবে রাজশাহীর বর্তমান সূচক উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণেরও বেশি।
এদিকে এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) হাসপাতালটিতে ৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন পাঁচজন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন দুজন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে এর আগে ১১ আগস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়।
পাঁচ এলাকায় এডিসের ব্যাপক বিস্তার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে চলতি আগস্ট মাসে নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডীপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হয়।
জরিপে ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এতে বাড়ির সূচক দাঁড়ায় ৩২ শতাংশ।
একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতে মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এতে পাত্রের সূচক দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৬৮৫টি মশার লার্ভার মধ্যে ৫০৫টি ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস, ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি এবং ৯৪টি ছিল অন্যান্য প্রজাতির মশার লার্ভা।
জরিপে ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, মাটি ও টিনের পাত্র, নারকেলের খোসা, সিমেন্টের টব, ড্রাম, জলমগ্ন মেঝে, রঙের বালতি ও প্লাস্টিকের বালতিসহ বিভিন্ন স্থানে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এডিস মশার প্রজননের জন্য সামান্য পানি জমে থাকাই যথেষ্ট। তাই শুধু বড় জলাশয় বা নোংরা স্থানে অভিযান চালিয়ে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাড়ি ও আশপাশে ছোট ছোট পাত্র বা স্থানে পানি জমে থাকছে কি না, সেদিকেও নিয়মিত নজর দিতে হবে।
মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণ ঝুঁকি
গত মে মাসে একই ধরনের জরিপে নগরীর ৭৫টি বাড়ির মধ্যে ১৫টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। তখন বাড়ির সূচক ছিল ২০ শতাংশ। ৫২টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ২৩টিতে লার্ভা পাওয়া যায়। সে সময় পাত্রের সূচক ছিল ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬।
দুই মাস পরের জরিপে বাড়ির সূচক বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ এবং পাত্রের সূচক দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ব্রেটো সূচক ৩০ দশমিক ৬৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬১ দশমিক ৩৩। অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রাজশাহীর সর্বশেষ ব্রেটো সূচক ৬১ দশমিক ৩৩, যা উচ্চ ঝুঁকির নির্ধারিত সীমার তিন গুণের বেশি।
তিনি বলেন, গত মে মাসের জরিপেও নগরীতে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। তখন ব্রেটো সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। দুই মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
রামেকেও বাড়ছে রোগীর চাপ
এডিস মশার বিস্তারের পাশাপাশি রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুন একজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩০ জুলাই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয়জনে। এরপর আগস্টে রোগীর সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে থাকে।
৬ আগস্ট হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ১৩ জন। ৮ আগস্ট এ সংখ্যা বেড়ে হয় ২৩, ৯ আগস্ট ২৬ এবং ১০ আগস্ট ৩০ জন। ১১ ও ১২ আগস্ট ২১ জন করে, ১৩ আগস্ট ২৮, ১৪ আগস্ট ৩০, ১৫ আগস্ট ৩৩, ১৬ আগস্ট ২৭, ১৭ আগস্ট ২৫, ১৮ আগস্ট ৩২ এবং ১৯ আগস্ট ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপরও রোগীর সংখ্যা ওঠানামা করেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪ জন।
মঙ্গলবার রামেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ বিএম কলেজের শিক্ষক গোলাম কবির (৫৫) তাঁর দুই সন্তান ইশতিয়াক আহমেদ (১৪) ও রওশন আক্তার (১৭) নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত শুক্রবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁরা রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন।
গোলাম কবির বলেন, ‘আমার পরিবারের সবাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। আমিও ভয় পাচ্ছি। শিবগঞ্জে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রামেকে ভর্তি হয়েছি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের তুষার (১৮) পাঁচ দিন ধরে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, চট্টগ্রামে কাজ করেন তিনি। সেখানে অসুস্থ হওয়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে আসেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামেকে ভর্তি হয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আব্দুল জলিল (৪৫) চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে জ্বর ও অসুস্থতা বাড়ার পর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।’
জনসচেতনতার বিকল্প নেই
রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নগরীতে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানি জমে থাকতে পারে—এমন বিভিন্ন সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রীতেও এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। জনসচেতনতা ছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালের প্রস্তুতি রয়েছে। এখন বৃষ্টির সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও সিটি করপোরেশনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের ফলাফল ও রামেক হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা—দুই দিকের চিত্রই রাজশাহীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে এডিস মশার প্রজনন, অন্যদিকে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর চাপ। ফলে শুধু হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করাই নয়, ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে নগরীর সম্ভাব্য সব প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস এবং সমন্বিত মশকনিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার তাগিদ দেখা দিয়েছে।
এসএ




Comments