রাজবাড়ীর বিনোদপুর এলাকায় ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় দা-বটির ঠুকঠাক শব্দ। পরিবারের পুরুষেরা যখন জীবিকার তাগিদে বাইরে বেরিয়ে যান, তখনই আপন কর্মব্যস্ততায় মেতে ওঠেন এলাকার নারীরা। বাঁশ দিয়ে নান্দনিক ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করে তারা এখন শুধু ঐতিহ্যই ধরে রাখছেন না, বরং সংসারে ফিরিয়েছেন সচ্ছলতা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিনোদপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শতাধিক নারী।
সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরেই নারীদের পাশাপাশি কিশোরীরাও বাঁশের পণ্য তৈরির কাজে যুক্ত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পূর্বপুরুষদের দেখে রপ্ত করা এই শিল্প এখন তাদের আয়ের প্রধান উৎস। পাহাড় থেকে আনা বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে তারা তৈরি করছেন বানা, ধান রাখার ডোল, মাছের ঘেরের বানা, পেঁয়াজ রাখার মাচা, গাছ সংরক্ষণের খাঁচা, সেমাইয়ের ঝুড়ি ও দাফনের চাটাইসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
নারী উদ্যোক্তা ফরিদা বেগম বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় জড়িত। ধান রাখার ডোল, মাছের ঘেরের বানা, মাছের মাচা, সেমাইয়ের ঝুড়ি ও চাটাইসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করি। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার চলে এই কাজ করেই। অনেকবার আমাদের তালিকা করা হয়েছে, কিন্তু সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা আমরা পাইনি।”
আরেক উদ্যোক্তা শারমিন জানান, “আমাদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় শতাধিক নারী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। সকাল থেকেই আমাদের কাজ শুরু হয়। তবে পাহাড়ি বাঁশ আমাদের মহাজনদের কাছ থেকে চড়া দামে কিনতে হয়। সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমরা এই কাজে আরও ভালো করতে পারতাম।”
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসেন বলেন, “এটি রাজবাড়ীর একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা যা নারীরা আজও টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণের আওতায় এনে সরকারি সহযোগিতা দেওয়া গেলে এই গ্রামীন অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে।”
এ বিষয়ে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন আশার কথা শুনিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) ও সমবায় সমিতির মাধ্যমে এসব নারী উদ্যোক্তাকে নিয়ে দল গঠন করা হবে। পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিনোদপুরের এই নারীরা প্রমাণ করেছেন, সঠিক সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কুটির শিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম।
ডিআর




Comments