৪১৮ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী টাঙ্গাইলের আতিয়া জামে মসজিদ
টাঙ্গাইল জেলা সদরের মাত্র ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৪১৮ বছরের প্রাচীন ‘আতিয়া জামে মসজিদ’। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি শুধু ধর্মীয় স্থাপত্য নয়, বরং এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সুলতানি ও মোগল আমলের ইতিহাস।
নামকরণের ইতিহাস:
‘আতিয়া’ শব্দটি আরবি ‘আতা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দানকৃত’। জানা যায়, সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ টাঙ্গাইল অঞ্চলের জায়গিরদার হিসেবে বাবা আদম কাশ্মীরি (র.)-কে নিযুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আফগান শাসক সোলায়মান কররানীর কাছ থেকে এলাকাটি দান হিসেবে পান। এই দানসূত্রে পাওয়া এলাকার নাম হয় আতিয়া, আর সেই নামানুসারেই মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘আতিয়া জামে মসজিদ’।
নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলী:
বাবা আদম কাশ্মীরি (র.)-এর প্রিয় ভক্ত সাঈদ খাঁ পন্নী ১৬০৮ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। এর স্থপতি ছিলেন মুহাম্মদ খাঁ। লাল রঙের টেরাকোটা ইটের তৈরি এই মসজিদটিতে চুন ও সুরকির নিপুণ গাঁথুনি রয়েছে। স্থাপত্যশৈলীতে সুলতানি আমলের বক্রাকার কার্নিশ, সুচাল খিলান ও গম্বুজের পাশাপাশি মোগল আমলের চমৎকার ফুল ও বৃত্তের নকশা লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের পশ্চিম পাশে প্রবেশপথে একটি বাঁধানো ঘাট ও বিশাল পুকুর রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
কাঠামো ও পরিচিতি:
মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৮.২৯ মিটার, প্রস্থ ১২.১৯ মিটার এবং দেয়ালগুলো ২.২৩ মিটার পুরু। এর চার কোণে চারটি অষ্টকোণাকৃতি মিনার রয়েছে। মসজিদ থেকে প্রাপ্ত আরবি ও ফারসি শিলালিপি থেকে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই মসজিদটির আলাদা পরিচিতির অন্যতম কারণ হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের পুরনো ১০ টাকার নোটে এই আতিয়া মসজিদের ছবি মুদ্রিত ছিল।
সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা:
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরানী এবং ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবী এটি সংস্কার করেন। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও অযত্ন আর অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। চুনকামের অভাব এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদটি তার জৌলুস হারাতে বসেছে। প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও দর্শনার্থীরা।
দেশ-বিদেশের পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আতিয়া জামে মসজিদ আজও এক পরম বিস্ময় ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ডিআর




Comments