Image description

একদিকে বাড়ছে পদ্মার পানি, অন্যদিকে ডুবে যাচ্ছে চরবাসীর ঘরবাড়ি, উঠান ও চলাচলের পথ। কোথাও ঘরের চারপাশে থইথই পানি, কোথাও গবাদিপশুর বিচরণস্থলটুকুও নেই। জীবন-জীবিকা বাঁচাতে কেউ পরিবার-পরিজন ও গৃহস্থালির মালামাল নৌকায় তুলছেন, কেউ আবার গবাদিপশু নিয়ে ছুটছেন নদীর ওপারে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। এভাবেই পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর চরাঞ্চলের কয়েক শ পরিবারে নেমে এসেছে দুর্ভোগ।

পানি বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে রাজশাহী নগরের শ্রীরামপুর ও পঞ্চবটি এলাকার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল এবং পবা, বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নগরের ওপারে পর্যটকদের কাছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত চরটিও চলে গেছে পানির নিচে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন চর খিদিরপুর ও মিডল চরের বাসিন্দারা। কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির সঙ্গে পদ্মার পানি বাড়ায় এসব এলাকার ঘরবাড়ি, উঠান ও চলাচলের পথ তলিয়ে গেছে।

তবে এখনো রাজশাহী নগর এলাকার জন্য নির্ধারিত বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি পদ্মার পানি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় নগরের বড়কুঠি পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ১২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৯৩ মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

এক দিনে বেড়েছে ১৭ সেন্টিমিটার

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৬টায় বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ০৫ মিটার। এর আগের দিন বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ১৬ দশমিক ৯৫ মিটার। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৭ সেন্টিমিটার।

পদ্মায় পানি বাড়ার এ প্রবণতা শুরু হয়েছে গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। মাঝেমধ্যে কয়েক দফা পানি কিছুটা কমলেও চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত আর কমেনি; বরং ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহীর গেজ রিডার এনামুল হক বলেন, গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই পদ্মার পানি বাড়ছে। মাঝেমধ্যে সামান্য কমলেও সেপ্টেম্বর মাসে পানি আর কমেনি। বরং ক্রমেই বাড়ছে।

পানিবন্দি প্রায় ৩০০ পরিবার

চর খিদিরপুর ও মিডল চরের বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক দিন ধরেই তাদের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকছে। অনেকের ঘরের আশপাশে শুকনো জায়গাটুকুও নেই। এতে একদিকে বসতভিটা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে গবাদিপশু রাখার জায়গা না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

শ্যামপুরের জাহাজঘাট এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, দুই চরের সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ও প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ পরিবার গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় করে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ডগার ঘাট এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

চর খিদিরপুরের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, আট দিন ধরে চর খিদিরপুর ও মিডল চরের প্রায় ৩০০ পরিবার পানিবন্দি। সঙ্গে রয়েছে হাজার হাজার গবাদিপশু। জীবন বাঁচাতে অধিকাংশ মানুষ গরু নিয়ে পদ্মার এপারে চলে এসেছেন। তিনিও পরিবার-পরিজন, গরু ও আসবাবপত্র নিয়ে নৌকায় করে ডগার ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন।

ঘর ছাড়লেও গবাদিপশু নিয়ে দুশ্চিন্তা

চরাঞ্চলের মানুষের কাছে গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, অনেক পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বন। ফলে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতভিটা ছাড়ার পাশাপাশি গবাদিপশু নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই এখন তাদের বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরবাসীরা জানান, পানি বাড়ার আগে অনেকে গবাদিপশু নিয়ে নদীর এপারে চলে এসেছেন। কিন্তু সবাই পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছেন না। ফলে কোথাও নৌকায়, কোথাও উঁচু স্থানে গবাদিপশু রাখার চেষ্টা করছেন তারা। পানির নিচে চলে গেছে হাজার হাজার গবাদিপশুর স্বাভাবিক বিচরণস্থলও।

প্রশাসনের ত্রাণ সহায়তা শুরু

পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা শুরু করেছে প্রশাসন। গত বুধবার ডগার ঘাট এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।

জেলা প্রশাসক বলেন, চর খিদিরপুর ও মিডল চরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে খাদ্যসহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের পরিস্থিতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পানি আরও বাড়লে বাড়বে দুর্ভোগ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, রাজশাহী নগর এলাকার বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে নদীর পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় এরই মধ্যে চরাঞ্চলের নিচু এলাকাগুলোতে তার প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, পানি আরও বাড়লে নতুন করে আরও এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এতে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি গবাদিপশু, ফসল ও বসতভিটা নিয়ে সংকটও তীব্র হতে পারে। ফলে বিপৎসীমা অতিক্রমের আগেই দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়, খাদ্য ও গবাদিপশুর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

এসএ