রাজশাহীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সচেতনতা বিষয়ক মতবিনিময় সভা
প্রজননস্থল ধ্বংসে নগরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় কেবল মশকনিধন বা পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ওপর নির্ভর না করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নগরবাসীকে সরাসরি ও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা সামান্য স্বচ্ছ পানিও এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি কোথাও যেন পানি জমতে না পারে, সে বিষয়ে নগরবাসীকে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নগর ভবনের সিটি হল সভাকক্ষে আয়োজিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতা বিষয়ক এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কীটতত্ত্ববিদ, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, এডিস মশা মূলত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। ফলে কেবল রাস্তাঘাট বা ড্রেন পরিষ্কার রাখলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিজ নিজ বাসাবাড়ি এবং আঙিনা পরীক্ষা করে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা ফুলের টবে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। নগরবাসীকে অন্তত সপ্তাহে একদিন নিজ দায়িত্ব এলাকা ও আঙিনা পরিষ্কার করার উদাত্ত আহ্বান জানান তারা।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের আন্তরিক সচেতনতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কর্মী হিসেবে তিনিও সরাসরি মাঠে কাজ করায় বিশ্বাসী।
রাসিক প্রশাসক আরও জানান, নগরবাসীকে ডেঙ্গুর স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে রাসিক ইতোমধ্যে সচেতনতা তৈরি, প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশকনিধন কার্যক্রম বেগবান করেছে। তবে পরিত্যক্ত পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে নাগরিকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’র সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে নগরজুড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মোফাখখারুল ইসলাম। তিনি বাসাবাড়িতে সপ্তাহে অন্তত একদিন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে দুই দিন বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর তাগিদ দেন।
এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধে যেকোনো জমে থাকা পানি তিন দিন পরপর ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মশা মারার চেয়ে মশার জন্মস্থান নির্মূল করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ সভায় জানান, রাজশাহীতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। দিনে বা রাতে মশার কামড় থেকে বাঁচতে বাধ্যতামূলকভাবে মশারি ব্যবহারের তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া কেবল জ্বর নয়, শরীরে যেকোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সভায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা এবং বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ান মো. আব্দুল বারী। রাসিকের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপের ওপর ভিজ্যুয়াল তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু।
রাসিকের সচিব মো. সোহেল রানার সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তাছমিনা খাতুন, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক নজরুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাকসহ রামেক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রাসিকের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলার লড়াই কোনো একক সংস্থার নয়। সার্বিক পরিচ্ছন্নতা ও দৈনন্দিন ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে এই জনস্বাস্থ্য সংকট থেকে নগরবাসীকে সুরক্ষা দিতে।
ডিআর




Comments